| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

আশুরা নিয়ে প্রচলিত যত ভুল ধারণা

reporter
  • আপডেট টাইম: জুন ২৫, ২০২৬ ইং | ১৩:৩০:৩৭:অপরাহ্ন  |  ১৫৬৮ বার পঠিত
আশুরা নিয়ে প্রচলিত যত ভুল ধারণা

রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: মুসলিম উম্মাহর কাছে পবিত্র মহররম মাস বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। এই মাসের ১০ তারিখ, অর্থাৎ আশুরার দিনটি ইসলামের ইতিহাসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। তবে সময়ের পরিক্রমায় আশুরাকে কেন্দ্র করে সমাজে নানা ধরনের বিশ্বাস, আচার ও প্রথা গড়ে উঠেছে, যার অনেকগুলোরই কোরআন ও সহিহ হাদিসে কোনো ভিত্তি নেই। ফলে প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা ও আমলের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে লোকাচার ও ভুল ধারণাই প্রাধান্য পাচ্ছে।

ইসলামী চিন্তাবিদরা বলছেন, আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য ও আমল সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কারণ, ধর্মীয় আবেগের সুযোগে অনেক ভিত্তিহীন তথ্য ও কুসংস্কার মুসলিম সমাজে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচলিত হয়ে এসেছে।

আশুরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব

ইসলামী ইতিহাস অনুযায়ী, মহররমের ১০ তারিখে মহান আল্লাহ ফেরাউনের জুলুম থেকে হজরত মুসা (আ.) এবং বনী ইসরাইলকে মুক্তি দান করেছিলেন। এ ঘটনার স্মরণে মদিনার ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা পালন করত।

হিজরতের পর মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় এসে বিষয়টি জানতে পারেন। তখন তিনি বলেন, হজরত মুসা (আ.)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে মুসলমানদের অধিকার ইহুদিদের চেয়ে বেশি। এরপর তিনি নিজে আশুরার রোজা পালন করেন এবং সাহাবিদেরও তা পালনের নির্দেশ দেন।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি সহিহ হাদিসে উল্লেখ আছে, রমজানের রোজা এবং আশুরার রোজা ছাড়া অন্য কোনো রোজার প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এত বেশি গুরুত্ব দিতে দেখা যায়নি। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে গণ্য হতো। পরে এটি নফল আমলে পরিণত হয়, তবে এর ফজিলত অপরিসীম।

হাদিসে এসেছে, আশুরার একটি রোজার বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা বান্দার বিগত এক বছরের ছোটখাটো গুনাহ মাফ করে দেন।

আশুরা নিয়ে যেসব ভুল ধারণা প্রচলিত

ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আশুরাকে কেন্দ্র করে সমাজে এমন কিছু বিশ্বাস ছড়িয়ে রয়েছে, যার কোনো নির্ভরযোগ্য ইসলামী ভিত্তি নেই। এসব ধারণার বেশিরভাগই লোকমুখে প্রচলিত হলেও কোরআন, সহিহ হাদিস কিংবা স্বীকৃত ইসলামী গ্রন্থে এর সমর্থন পাওয়া যায় না।

হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি দিবস

অনেকেই মনে করেন, আশুরার দিন হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছিল। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো সহিহ হাদিস বা নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায় না।

হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্মদিন

আশুরার দিন হজরত ইব্রাহিম (আ.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন—এমন কথাও প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু ইসলামী গবেষকরা বলছেন, এ তথ্যের পক্ষে গ্রহণযোগ্য কোনো দলিল নেই।

আশুরার গোসল রোগমুক্তির নিশ্চয়তা দেয়

সমাজে একটি ধারণা রয়েছে যে, আশুরার দিনে গোসল করলে সারা বছর রোগবালাই থেকে নিরাপদ থাকা যায়। অথচ ইসলামী শরিয়তে এমন কোনো নির্দেশনা নেই। এটি সম্পূর্ণ একটি লোকজ বিশ্বাস।

সুরমা ব্যবহার করলে চোখের রোগ হয় না

আশুরার দিনে চোখে সুরমা দিলে দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায় বা চোখের রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়—এমন বিশ্বাসও অনেকের মধ্যে দেখা যায়। তবে এর পক্ষে কোনো বিশুদ্ধ হাদিস পাওয়া যায় না।

বিশেষ খাবার রান্না ও বিতরণ

অনেক এলাকায় আশুরাকে কেন্দ্র করে খিচুড়ি বা বিশেষ খাবার রান্না করে বিতরণের প্রচলন রয়েছে। ইসলামে নির্দিষ্ট কোনো খাবার রান্না বা বিতরণের নির্দেশনা নেই। পরিবারকে ভালো খাবার খাওয়ানো অবশ্যই ভালো কাজ, কিন্তু এটিকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা বা বিশেষ সওয়াবের আমল মনে করা সঠিক নয়।

আশুরা অশুভ দিন নয়

কিছু মানুষ আশুরাকে শোক, দুর্ভাগ্য বা অশুভতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখেন। ইসলাম এ ধারণা সমর্থন করে না। ইসলামে কোনো দিন বা সময়কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অশুভ মনে করার সুযোগ নেই।

প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম মুফতি তাকি উসমানি বলেন, কোনো দিন নিজে নিজে ভালো বা মন্দ হয় না; আল্লাহ যে দিনকে মর্যাদা দেন, কেবল সেটিই মর্যাদাপূর্ণ হয়।

১০ মহররমেই কেয়ামত হবে!

প্রতি বছরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আশুরার দিন কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ দাবির পক্ষে কোরআন বা সহিহ হাদিসে কোনো স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

কারবালার ঘটনা ও আশুরার সম্পর্ক

মহররমের ১০ তারিখ ইসলামের ইতিহাসে আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনার স্মারক। এই দিনে মহানবী (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা কারবালার প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করেন।

তবে আলেমরা বলেন, কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার বহু আগে থেকেই আশুরা একটি মর্যাদাপূর্ণ ও ফজিলতময় দিন হিসেবে স্বীকৃত ছিল। আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম প্রজ্ঞায় এই মর্যাদাবান দিনেই ইমাম হোসেন (রা.)-কে শাহাদাতের মহান মর্যাদায় ভূষিত করেছেন।

তাই আশুরার মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, ত্যাগ, ধৈর্য, সত্যের পথে অবিচল থাকা এবং ইবাদতের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করা। শোক প্রকাশের নামে বুক চাপড়ানো, মাতম করা বা শরীরের ক্ষতি করা ইসলামের শিক্ষা নয় বলে উল্লেখ করেছেন আলেমরা।

আশুরার দিনে করণীয়

ধর্মীয়ভাবে প্রমাণিত ও সুন্নাহসম্মত আমলগুলো অত্যন্ত সহজ এবং সবার জন্য পালনযোগ্য।

এর মধ্যে রয়েছে

  • মহররমের ৯ ও ১০ তারিখ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ রোজা রাখা।
  • বেশি বেশি জিকির, তাসবিহ ও ইস্তিগফার করা।
  • সাধ্যমতো দান-সদকা করা।
  • হজরত মুসা (আ.)-এর মুক্তির ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
  • আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্য প্রকাশ করা।

কুসংস্কার নয়, হোক সহিহ আমলের চর্চা

ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে কুসংস্কার, লোকজ বিশ্বাস এবং ভিত্তিহীন প্রচলন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোরআন ও সহিহ হাদিসভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে আশুরার শিক্ষা ও আমলকে জীবনে ধারণ করাই একজন মুসলমানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

পবিত্র এই দিনটি হোক আত্মশুদ্ধি, কৃতজ্ঞতা, ত্যাগ ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য সুযোগ—এমনটাই প্রত্যাশা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের।


রিপোর্টার্স২৪/ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪