রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: পুলিশের ক্ষুদ্র একটি অংশের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধের দায় পুরো পুলিশ বাহিনী নেবে না বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেছেন, বড় ধরনের অন্যায়, অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে পুলিশ কাজ শুরু করলে তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো হয়। একই সঙ্গে ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের বাংলাদেশ পুলিশ অডিটরিয়ামে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ মেধাবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আইজিপি।
মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘আপনারা জানেন, আমরা যখন কোনো বড় ধরনের অন্যায়-অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কাজ শুরু করি, তখন আমাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হয়, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়। এ ধরনের হলুদ সাংবাদিকতার কারণে... আমি বলছি, যারা ভালো সাংবাদিক, ৯৯ শতাংশ—তাদের বলব, আপনারা রুখে দাঁড়ান।’
পুলিশ বাহিনীতেও খারাপ লোক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি একবার বলেছিলাম, আমাদের পুলিশের এক শতাংশ লোকও খারাপ না। এটা নিয়ে মিডিয়াতে বলা শুরু হলো—তিনি পুলিশের অনিয়মকে জায়েজ করার চেষ্টা করছেন। না, আমি বিভিন্নভাবে তথ্য নিয়েছি। আমাদের মধ্যে অপরাধে জড়িত শূন্য দশমিক সত্তর শতাংশ। এক পার্সেন্টও হয় না। ওই অল্পসংখ্যক করাপ্টেড সদস্যের জন্য আমার গোটা পুলিশ বাহিনী কেন দায় নেবে?’
সাংবাদিকদের উদ্দেশে আইজিপি বলেন, ‘আমি আপনাদের বলব, আমি যদি অপরাধ করে থাকি, আপনারা সেটাই লেখেন। কিন্তু অপবাদ দিয়ে একজনের মনোবল নষ্ট করা এটার বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র আছে।’
তিনি আরও বলেন, আপনারা জানেন, বিগত ১৭ বছর অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ব্যাংকগুলো শূন্য হয়ে গেছে। আপনার জমা রাখা টাকা ফেরত পেতে ব্যাংকে আবেদন করতে হচ্ছে। সুতরাং কোনো ষড়যন্ত্র নয়। আসুন, ষড়যন্ত্রকারীদের আমরা চিহ্নিত করি। আপনাদের ভেতরেও কিন্তু ষড়যন্ত্রকারী আছে। আমার (পুলিশ বাহিনীর) ভেতরেও আছে। সারা বাংলাদেশেই আছে। আমরা সবাই মিলে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই।
আইজিপি বলেন, জুলাই বিপ্লবের পরে নতুন প্রজন্মের অনেকেই ট্রাফিক পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বাহাসে লিপ্ত হচ্ছে এবং অনেক সময় উল্টাপাল্টা কথাবার্তা বলছে।
তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা যদি ঠিক না থাকে, আপনার-আমার নিরাপত্তা যদি ঠিক না থাকে, আপনার সম্পদ-বাড়ি-গাড়ি আছে কিন্তু বাড়ি থেকে বের হয়ে যদি ফেরার নিশ্চয়তা না থাকে, তবে দেশটা অকার্যকর হয়ে যাবে।’
মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারীসহ বিভিন্ন অপরাধীদের আইনের ফাঁকফোকরের কারণে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা সম্ভব হচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন পুলিশ প্রধান।
তিনি বলেন, মাদক ও ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে অনেক অপরাধীকে একাধিকবার আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু আইনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের দীর্ঘদিন আটক রাখা সম্ভব হয় না। পরে তারা আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘আমরা মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি। প্রত্যেক মাদক কারবারি ও প্রত্যেক ছিনতাইকারী একাধিকবার আইনের আওতায় এসেছে। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকরের কারণে তাদের ওইভাবে আটকে রাখতে পারিনি। তারা আবার বের হয়ে একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।’
মাদক ও ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান আইজিপি।
তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা খুবই কম। প্রায় এক হাজার মানুষের জন্য মাত্র একজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে।
মাদক নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করছে উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক নানা নামে তরুণদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। অনেক সময় এসব মাদককে ‘এনার্জি ট্যাবলেট’ বা আকর্ষণীয় অন্য কোনো নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। তাই এ বিষয়ে সন্তানদের সচেতন করতে হবে।
পুলিশ প্রধান শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে বলেন, সাময়িক কৌতূহল বা কোনো প্ররোচনায় মাদকের ভয়াল থাবা যেন তাদের স্পর্শ করতে না পারে, সেজন্য সবসময় সজাগ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাদক একটি মরণফাঁদ।
একই সঙ্গে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেট গেমে অতিরিক্ত আসক্তিও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্যের আসক্তির মতোই ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আইজিপি বলেন, প্রযুক্তিকে তোমরা ব্যবহার করবে, প্রযুক্তি যেন তোমাদের ব্যবহার করতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। দেশের নাগরিক হিসেবে দেশের আইন মেনে চলবে এবং অন্যদের আইন মেনে চলতে উৎসাহিত করবে।
বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থায়নে আয়োজিত এ মেধাবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের বৃত্তি দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ৮০১ জন এবং এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ২৭২ জন শিক্ষার্থী মেধাবৃত্তি পেয়েছে। একইভাবে ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ৮৪৫ জন এবং এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ১৯৫ জন শিক্ষার্থী মেধাবৃত্তি লাভ করেছে।
২০২৪ ও ২০২৫ এই দুই বছরে বাংলাদেশ পুলিশের মেধাবৃত্তি পেয়েছে সর্বমোট ২ হাজার ১১৩ জন মেধাবী শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকায় অবস্থানরত ৩৬০ জনকে বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। অন্যদের সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের মাধ্যমে মেধাবৃত্তি প্রদান করা হবে।
অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেনের সভাপতিত্বে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বক্তব্য দেন। স্বাগত বক্তব্য দেন এআইজি ইসমাইল হোসেন।
অনুষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা, অভিভাবক এবং মেধাবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম