আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি : সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান সম্প্রতি এক বিস্ফোরক অভিযোগে বলেছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে গিয়ে ভারত-মার্কিন সম্পর্ককে বলি দিয়েছেন।
সুলিভান এই ঘটনাকে ট্রাম্প আমলের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে অবমূল্যায়িত ও কম প্রচারিত দিকগুলোর একটি” বলে অভিহিত করেছেন। মেইডাস টাচ ইউটিউব চ্যানেলের এক আলোচনায় সুলিভান বলেন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দুই দলের প্রশাসনই বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের সঙ্গে প্রযুক্তি, প্রতিভা, অর্থনীতি এবং বিশেষত চীনের কৌশলগত প্রভাব মোকাবিলার মতো ক্ষেত্রে একটি সুদৃঢ় অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ফলে সেই অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বড় কৌশলগত ক্ষতি।সুলিভান উল্লেখ করেন যে পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক যোগসূত্রই ভারতের প্রতি এই অবহেলার মূল কারণ। পাকিস্তানের নতুন ক্রিপ্টো কাউন্সিলের সঙ্গে ট্রাম্প পরিবারের ব্যাক করা ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’-এর চুক্তি এবং ইসলামাবাদ কর্তৃক ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়া—এসব ঘটনাকেই সুলিভান এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তার ভাষায়, ভারত-মার্কিন অংশীদারিত্ব যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থ রক্ষায় অপরিহার্য ছিল, আর সেটিকে উপেক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্যও এক উদ্বেগজনক বার্তা।
ট্রাম্প প্রশাসন ভারতে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, যার কারণ হিসেবে বাণিজ্য ঘাটতি এবং রাশিয়ান তেল কেনাকে দেখানো হয়। কিন্তু জেফেরিজ এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের প্রকাশ্য সমালোচনা—যেখানে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার মিথ্যাচার ফাঁস হয়ে যায়—ই মূলত তার প্রতিশোধমূলক নীতির কারণ ছিল। অপরদিকে পাকিস্তানের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক ছিল মাত্র ১৯ শতাংশ। এই দ্বৈত নীতি শুধু ভারত নয়, জার্মানি, জাপান কিংবা কানাডার মতো মিত্র দেশগুলোকেও শঙ্কিত করেছে যে ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গেও একই আচরণ হতে পারে। সুলিভানের ভাষায়, “এটি প্রমাণ করছে যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অন্ধ বিশ্বাস রাখা আর সম্ভব নয়, এবং মিত্র দেশগুলো নিজেদের বিকল্প খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করবে।
সুলিভান আরও সতর্ক করে বলেন, ভারতের সঙ্গে এই সম্পর্কের অবনতির প্রতিফলন কেবল দ্বিপাক্ষিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা যুক্তরাষ্ট্রের সব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জোটের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রাম্প চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করলেও, বেইজিংয়ের পাল্টা চাপের মুখে তিনি পিছিয়ে আসেন। ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এক অচলাবস্থায় পৌঁছায়।সম্প্রতি টিম মিলারের ‘দ্য বালওয়ার্ক’ পডকাস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুলিভান যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভাবমূর্তির অবনতির দিকটিও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে “সবচেয়ে বড় বিপর্যয় সৃষ্টিকারী শক্তি” হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার ওপর নির্ভর করা যায় না। তার মতে, “চীন এখন অনেক দেশে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। মাত্র এক বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। এখন তারা মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ড ধ্বংসপ্রাপ্ত, আর চীন হচ্ছে দায়িত্বশীল শক্তি।”পাকিস্তান এই বছরের ২৬ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পাকিস্তান ক্রিপ্টো কাউন্সিল’ চালু করে, যার লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিপ্টো কেন্দ্র হওয়া।
উদ্বোধনের পরপরই ট্রাম্প পরিবারের প্রভাবাধীন ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’-এর সঙ্গে চুক্তি হয়। এই প্ল্যাটফর্মের ৬০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে ‘ডিটিমার্কস ডিফাই এলএলসি’-র হাতে, যা ট্রাম্পের দুই ছেলে এরিক ট্রাম্প এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের নিয়ন্ত্রণে। ওয়েবসাইটে ট্রাম্পকে “চিফ ক্রিপ্টো অ্যাডভোকেট” হিসেবে প্রচার করা হয়েছে এবং তার ছবি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে “ডোনাল্ড জে ট্রাম্প দ্বারা অনুপ্রাণিত” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুলিভানের মতে, পাকিস্তানের এই ব্যবসায়িক চুক্তি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত পরিবর্তন একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, যা প্রমাণ করে যে ট্রাম্প পরিবারের ব্যক্তিগত স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতিকে প্রভাবিত করেছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম