রিয়াজুল হক:
দক্ষিণ-পশ্চিম পাকিস্তানের বিস্তৃত ও খনিজ-সমৃদ্ধ এলাকা বেলুচিস্তান আবার আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে। প্রশ্ন উঠছে: বেলুচিস্তান কি স্বাধীনতার পথে এগোচ্ছে? নাকি এটি আরও একটি দমন-পীড়নের অধ্যায় মাত্র?
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার পর ২২৭ দিন পর্যন্ত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র ছিল স্টেট অফ কালাত বা বেলুচিস্তান। তারা পাকিস্তানের অংশ হতে চায়নি। কিন্তু ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানে স্বতন্ত্র শাসক রাজাদের শাসনে থাকা রাজ্যগুলোর পক্ষে স্বাধীন থাকা আর সম্ভব হয়নি। বর্তমানে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশ এবং আফগানিস্তানের একটি ছোট অংশে বিভক্ত প্রাচীন বেলুচিস্তান। আফগানিস্তানের নিমরুজ, হেলমান্দ ও কান্দাহারও আগে বেলুচিস্তানের অংশ ছিল।
বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ, যা ভৌগোলিকভাবে প্রায় ৪৪% জমি জুড়ে বিস্তৃত, অথচ জনসংখ্যা অনুযায়ী এটি সবচেয়ে কম ঘনবসতিপূর্ণ। এ প্রদেশে রয়েছে তেলের খনি, প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য খনিজসম্পদ। অথচ এখানকার বাসিন্দারা বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ করে আসছে—এই সম্পদের সঠিক বণ্টন থেকে তারা বঞ্চিত।
বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের স্বাধীনতার দাবি নতুন কিছু নয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ সময় থেকেই তারা স্বতন্ত্র পরিচয়ের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই এই অঞ্চলে বারবার সামরিক অভিযান, নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কর্মী, রাজনৈতিক নেতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত ও আন্তর্জাতিকভাবে নজরকাড়া হয়ে উঠেছে। তারা এখন কেবল পাকিস্তানি সামরিক ও সরকারি স্থাপনাকে নয়, চীনা প্রকল্প, বিশেষ করে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) এর বিরুদ্ধেও সরব। বেলুচদের দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের ভূমি ও সম্পদ লুটে নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু জনগণের উন্নয়নে কোনো প্রতিফলন নেই।
তবে গত ৯মে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ দিয়েছে বেলুচিস্তান। বিখ্যাত সাহিত্যিক মির ইয়ার বালুচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ভারতের কাছে ছাড়াও জাতিসংঘের কাছে স্বাধীন বেলুচিস্তানের স্বীকৃতি চেয়েছেন।
তবে বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতা ঘোষণার স্বপ্ন দেখা যতটা রোমাঞ্চকর শোনায়, রাজনৈতিক বাস্তবতা ততটাই জটিল। আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, পাকিস্তানের পরমাণু অবস্থান এবং চীনের স্বার্থ, এসব মিলিয়ে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা এখনো একটি দূরাশার মতো।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, বারবার বিদ্রোহ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদন, এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের ক্ষোভ, এগুলি কোন দিন বিস্ফোরণের রূপ নেবে কী? কারণ স্বাধীনতাকামী মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা দমিয়ে রাখা যায়, মুছে ফেলা যায়না।
লেখকঃ রিয়াজুল হক, যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।