রিপোর্টার্স ডেস্ক: নিজস্ব ভবন নেই, শ্রেণিকক্ষ নেই, শিক্ষার্থীও নেই। আছে কেবল এমপিওভুক্ত শিক্ষক, পাচ্ছেন নিয়মিত বেতন। কলেজের অধ্যক্ষের সনদও জাল। শুধু তাই-ই নয়, কলেজের ঠিকানা ঢাকার মতিঝিল। তবে কার্যক্রম চলে গ্রামের একটি স্কুলে।
গণমাধ্যমের কাছে শিক্ষকদের সনদ জালিয়াতির তথ্য আসে। কিন্তু কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে এলো সাপ। সম্প্রতি, পরিদর্শক ও নিরীক্ষা অধিদফতর ৪৭১ শিক্ষকের জাল সনদের তালিকা পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। এই তালিকায় দেখা যায় ঢাকা সিটি ইন্টারন্যাশনাল কলেজের অধ্যক্ষ মাহবুবুল ভুইয়্যার নাম। ঠিকানা মতিঝিলের শহীদবাগ। কয়েক ঘণ্টা ঘুরেও হদিস মেলেনি কলেজের।
স্থানীয় দুজনের তথ্য অনুসরণ করে যেতে হয় শান্তিবাগ উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানেই নাকি ঢাকা সিটি ইন্টারন্যাশনাল কলেজ। কিন্তু স্কুল ছাড়া কলেজের কোনো নামফলক নেই। ভেতরে ঢুকতেই দেখা হয় দুই নিরাপত্তারক্ষীর সঙ্গে। জানালেন এক যুগ আগে শহীদবাগ থেকে শান্তিবাগে আসে ঢাকা সিটি ইন্টারন্যাশনাল কলেজ। স্কুলের কয়েকটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে চলে কার্যক্রম। কিন্তু বহুদিন ভাড়া দিতে না পারায় মাস ছয়েক আগে এখান থেকে চলে যায়।
তাহলে কলেজটির নতুন ঠিকানা কোথায়? শান্তিবাগ স্কুলের নিরাপত্তারক্ষীরা সঠিক তথ্য দিতে না পারলেও অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে কলেজের একজন স্টাফের মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়।
ফোনালাপের সূত্র ধরে গণমাধ্যমকর্মীরা ছুটে যান ঢাকার অদূরে নাসিরাবাদ গ্রামের দিকে। মূলসড়ক পেরিয়ে নড়াই নদীর ত্রিমোহনী। ব্রিজ পেরিয়ে গ্রামীণ ছায়া ঘেরা নাসিরাবাদ স্কুল। ছয়তলা ভবনের উচ্চবিদ্যালয় লাগোয়া নাসিরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পাশেই আরও একটি ভবন। জাতীয় পতাকা উড়ছে আর ভেতরে চলছে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান। কিন্তু ঢাকা সিটি ইন্টারন্যাশনাল কলেজ কোথায়? স্কুলের একজন শিক্ষক জানালেন, এইটাই কলেজ!
কলেজের কারও দেখা তখনও না পেলেও স্কুল ফাউন্ডার পরিচয় দেয়া এক ব্যক্তির চেষ্টা প্রশ্নবাণে আক্রমণের। একপর্যায়ে এলেন কলেজের অধ্যক্ষ মাহবুবুল ভু্ইয়্যাও। এ সময় কয়েকজন ক্যামেরা বন্ধের জন্য করলেন হৈচৈ। অধ্যক্ষ প্রস্তাব দিলেন রুমে গিয়ে কথা বলার।
ভবন নেই, ক্লাসরুম নেই, নেই শিক্ষার্থী- এর কারণ বলকে অধ্যক্ষ জানালেন তিনি কলেজে যোগদান করেছিলেন, কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে। কপালগুণে তিনিই সর্বেসর্বা অধ্যক্ষ। তবে যেই সনদ বলে চাকরি নিয়েছেলেন, সেই সনদটিও জাল।
মাহবুবুল ভু্ইয়্যা আরও জানান, ২৪ জন শিক্ষকের সবাই এমপিওভুক্ত। বেতন পাচ্ছেন নিয়মিত।
পাশে থাকা আরেক স্টাফ আনিসুর রহমানের দাবি, ত্রিশ চল্লিশ জন শিক্ষার্থী আছে তাদের। তাহলে কলেজ খোলার দিনে শিক্ষার্থীরা কোথায়? এই প্রশ্নের জবাব নেই কারও কাছে। আছে অনুনয়-অনুরোধ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিদর্শন করে থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতর। তারা স্বশরীরেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রতিবেদন দেন। কিন্তু ঢাকা সিটি ইন্টারন্যাশনাল কলেজের ক্যাম্পাসই যেখানে নেই সেখানে কীভাবে সংশ্লিষ্টরা এখনো বেতনভাতা পাচ্ছেন?
এ বিষয়ে পরিদর্শন নিরীক্ষা অধিদফতরের পরিচালক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কলেজটির বিষয়ে আমরা খতিয়ে দেখবো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে আমাদের নিরীক্ষা এবং প্রদর্শনীর আওতায় আনবো।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি শিক্ষকদের জন্য লজ্জার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিটের অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, ‘শিক্ষা ক্ষেত্রে যখন শিক্ষকরা এমন কাজ করেন তখন চরম নৈতিকতার পতন। এমন প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
৪৭১টি ভুয়া শিক্ষক সনদের একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান যাচাই করতে গিয়েই দেখা গেছে, কিভাবে স্কুলের পেটে ঢুকে গেছে কলেজ। বাকিগুলোর পরিস্থিতি কেমন সেই প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। সূত্র: সময় টিভি
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব