রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক : বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের মাত্র ০.৫ শতাংশের জন্য দায়ী হলেও, বর্তমানে দেশের মাথাপিছু জলবায়ু ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৯.৬ মার্কিন ডলার, যা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
‘ক্লাইমেট ডেট রিস্ক ইনডেক্স (সিডিআরআই-২০২৫)’এ এই তথ্য উঠে এসেছে। শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জলবায়ু বিষয়ক গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের ১৩ কোটিরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,৩৬০ কোটি মার্কিন ডলার। এত কিছুর পরেও জলবায়ু অভিযোজন খাতে সহায়তা নগণ্য। অন্যদিকে, দেশের পরিবারগুলো স্ব-অর্থায়নে জলবায়ু ঘটিত বিপর্যয় থেকে সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রতি বছর মাথাপিছু গড়ে ১০,৭০০ টাকা (প্রায় ৮৮ মার্কিন ডলার) ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে, যা জাতীয় পর্যায়ে বার্ষিক ১৭০ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়ায়।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমে, কিন্তু কপ (COP)-এর মতো বৈশ্বিক ফোরামে বাস্তব ফল কম-ফলে মানুষ ঝুঁকিতে থাকে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায়ে উল্লেখিত অসম কার্বন নিঃসরণ প্রশ্নে বাংলাদেশকে সাড়া দিতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ও এনডিসি বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ. কে. ইনামুল হক বলেন, জলবায়ু বিজ্ঞান, তবু বাংলাদেশ গভীর ঝুঁকিতে। অনুদান সীমিত, ঋণের ঝুঁকি বেশি, বেসরকারি খাতে অতিনির্ভরতা আর্থিক চাপ বাড়ায়। ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়ের ওপর মানবপাচারের মতো হুমকিও থাকে। টেকসই শক্তি গড়তে স্থানীয় জ্ঞান, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থা-পরিবর্তন দরকার-খণ্ড খণ্ড সমাধান যথেষ্ট নয়।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম. জাকির হোসেন খান বলেন, দৃঢ় অঙ্গীকার ও স্পষ্ট শাসনব্যবস্থা না থাকলে কপ-২৯-এ ঘোষিত ১ বিলিয়ন ডলারের ‘ক্লাইমেট ফাইন্যান্স অ্যাকশন ফান্ড’ উচ্চাশাই থেকে যাবে; ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য প্রকৃত লাইফলাইনে পরিণত হবে না।
ঢাকায় নিযুক্ত সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ও ডেপুটি হেড অব ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন নায়োকা মার্টিনেজ ব্যাকস্ট্রম বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন হতে হবে জবাবদিহিমূলক, ন্যায্য ও ফলদায়ক সম্পদ রক্ষা ও ন্যায়সঙ্গত রূপান্তরের জন্য। অনুদানের বাইরে নতুন উৎস দরকার। ‘ক্লাইমেট ভলনারেবিলিটি ইনডেক্স’ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেটিং বরাদ্দে পথ দেখাতে পারে, তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো কমিউনিটিতে বাস্তব প্রভাব।
পিকেএসএফ-এর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ বলেন, অ্যাডাপ্টেশন ফাইন্যান্স অনুদানভিত্তিক ও ন্যায়ের ভিত্তিতে না হলে বিশ্ব জলবায়ু ঋণ–সংকটে পড়তে পারে। যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের বেঁচে থাকাই ব্যয়বহুল হয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত সবার স্থিতিশীলতাই হুমকিতে পড়বে।
সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের কোঅপারেশন অফিসার শিরিন লিরা বলেন, বাংলাদেশ যদি জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারে এবং অর্থ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে না পৌঁছায় তাহলে বৈশ্বিক অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হবে। শুধু নীতি নয়; দুর্যোগে প্রথম সাড়া দেন স্থানীয় মানুষ। তাদের সক্ষমতা না বাড়ালে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার মাঠে ফল দেবে না।
গ্রিনপিস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গ্রিনস্পিকার ফারিয়া হোসাইন ইকরা বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে; ন্যায়সঙ্গত জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়া আরও কঠিন হবে। বড় নিঃসরণকারীদের জবাবদিহিতায় আনতে ও প্রাপ্য সহায়তা আদায়ে আইসিজের পরামর্শমূলক মতামত কীভাবে আইনি হাতিয়ার হতে পারে, তা খুঁজে দেখা দরকার।
বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিশেষ সহকারী ড. সাইমন পারভেজ বলেন, বাংলাদেশের নিঃসরণ কম, প্রভাব বেশি। জলবায়ু অর্থায়ন ঋণ-নির্ভরতা থেকে সরে ন্যায় ও সমতার দিকে যেতে হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বাস্তব অভিযোজন সহায়তাসহ। প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান, নৌপথ পুনরুদ্ধার, নবায়নযোগ্য শক্তি, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি-এসব কাজে বিশেষজ্ঞতা, জাতীয় অঙ্গীকার ও বৈশ্বিক সংহতি প্রয়োজন। জলবায়ু ঋণের যুগ শেষ হোক, জলবায়ু ন্যায়ের যুগ শুরু হোক।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) যুগ্মসচিব ড. কাজী শাহজাহান বলেন, জলবায়ু বিজ্ঞান রাজনীতি, অর্থনীতি ও মানব আচরণের সঙ্গে জড়িত। কার্যকর অর্থায়নের জন্য জাতীয়-আন্তর্জাতিক নীতিমালা বুঝতে হবে, বৈশ্বিক উন্নয়ন কাঠামো থেকে শিখতে হবে এবং তথ্য-সম্পদের কৌশলী ব্যবহার করতে স্থানীয় সক্ষমতা গড়তে হবে।
রিপোর্টার্স২৪/আয়েশা