ভাঙাগড়া (দুই)
ছোঁয়া মেসেঞ্জার চ্যাটিংয়ে উত্তরের অপেক্ষায়। কিছুক্ষণেই ছিন্নমূলের উত্তর এলো। সে লিখেছে -- আসলেই ঠিকানা মনে নেই। নইলে যেতাম।
ছোঁয়া লেখলো -- বিস্ময়কর মানুষ আপনি ! নিজের ঠিকানা কেউ ভুলে যায় নাকি ?
-- আপনি ঠিক বলেছেন। আমার মত হতভাগা বোধ করি কোথাও নাই।
-- লিখেছেন, আপনার জন্য কেউ পথচেয়ে নেই। আসলেই কি সত্যি ?
-- আমি কবি সাহিত্যিক নই। কবিরা কল্পনা করে লেখেন। আমি লিখেছি, আমার জীবন থেকে। তাই মিথ্যে লিখি নাই।
ছোঁয়া একটু ভেবে নিয়ে লিখলো -- আপনার কি মা-বাবা নাই ?
-- মাকে হারিয়েছি ছোটবেলায়। দুই বছর আগে বাবাকেও।
-- ভাই-বোন ?
-- আপন ভাইবোন নাই। সৎভাই পাঁচ জন। আমি তাদের পথের কাঁটা। তাই উপড়ে ফেলে দিয়েছে।
-- এমন হলে আপনি কাউকে আপন করে নিতে পারেন। তখন পথচেয়ে থাকার মানুষের অভাব হবে না।
-- কি যে বলেন ! আমার মত ছিন্নমূলকে আপন করে নেয়ার মত পাগল পাবো কই ?
-- খুঁজলেই পেয়ে যাবেন।
-- আপনি পৃথিবীকে চিনতে পারেননি। আমি ঠিক চিনেছি। এখানে কিছু নাই মানে কেউ নাই।
-- আপনি ভুল বুঝেছেন। সব মানুষ সমান হয় না।
-- সেটা ঠিক। তবে আমি যা বলেছি, এ-ও বেঠিক না। পৃথিবীতে সম্পদের সমকক্ষ কিছুই নাই।
ছোঁয়া লিখলো -- একথা আমি মানতে পারছি না।
-- এ আপনার মুখের কথা। না ভেবেই লিখে ফেলেছেন।
-- মানে ?
-- মানে হচ্ছে, আমার পোস্ট পড়ে আপনার সহানুভূতি জেগেছে। তাই এমন লিখেছেন। আমাকে চিনলে আপনিও আমার পোস্ট আর পড়তে চাইবেন না। এমন কি আনফ্রেন্ড করে দেয়ার ইচ্ছাও জাগতে পারে।
জবাবে ছোঁয়া কিছু লিখছিলো। এর মাঝেই ছিন্নমূলের আরেকটা মেসেজ -- তাই আপনার সহানুভূতিপূর্ণ মন্তব্য থেকে বঞ্চিত হতে চাই না। ভালো থাকবেন। শুভরাত্রি।
ইচ্ছে থাকা সত্বেও এর পৃষ্ঠে ছোঁয়া কিছু লিখতে পারেনি। হতাশা নিয়ে ছিন্নমূলের পোস্টের কমেন্টগুলো দেখতে লাগলো। ১২৩ টি লাইক, ৪৭ টি কমেন্ট। ছোঁয়া কমেন্টগুলোতে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে। এসময় একটা মন্তব্য তাকে থামিয়ে দিলো। পোস্টের সাথে সম্পর্কহীন মন্তব্যটা এরকম--
কিরে, বাংলাদেশ ব্যাংকে দরখাস্ত করেছিস্ ?
ছিন্নমূল জবাব দিয়েছে-- হ্যা, করেছি। তুই করিস্ নি ?
ছিন্নমূলের পোস্টে এই মন্তব্যটি নিয়ে ভাবতে গিয়ে ফেসবুকের অন্যান্য পোস্টগুলো দেখে নেয়া ছোঁয়ার পক্ষে আর সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকে ছিন্নমূলের দরখাস্ত করা, একটা দরখাস্তে ঠিক শুভর মত ছবি পাওয়া, সেদিনের ওয়াইফাইয়ের নেট বিভ্রান্তি, সবকিছু মিলে তার মগজে তালগোল পাকিয়ে দিতে লাগলো। গত ঈদে শুভ বাড়ি গিয়েছিল কিনা, তা-ও সে স্মরণ করতে পারছে না। তাই সিদ্ধান্ত নিলো, সামনের ঈদে শুভ বাড়ি যায় কি না, এটা সে লক্ষ্য রাখবে।
ঈদের দিন। শুভ বাড়ি যায়নি। বরং মাংস কাটার কাজে কসাইদের সহযোগিতা করছে। এতে ওর সাথে কথা বলার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না ছোঁয়া। পড়ন্ত বিকেলে কসাইরা বিদায় নিলে সে গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে থেকেই দেখতে পেলো শুভ তার কক্ষে শুয়ে মোবাইল টিপছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো -- শুভ কি ঈদে বাড়ি যাবে না ?
ছোঁয়া কোনদিন শুভর সাথে এভাবে কথা বলে না। দুজনে কথার মাঝে ফরমায়েশ ছাড়া অন্য প্রসঙ্গের ইতিহাস নেই। তাই ওর এরকম প্রশ্নে শুভ প্রথমে থতমত খেয়ে গেলো। উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। এতে ছোঁয়াই আবার বললো-- নাকি, ঠিকানা ভুলে গেছো ?
শুভ তখনও নিজেকে স্বাভাবিক করে নিতে পারেনি। কোনো রকমে বললো -- না, ঠিকানা ভুলে যাইনি। যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছি।
আন্দাজে ভর করে ছোঁয়া বললো -- গত ঈদেও তো যাওনি, নাকি ?
শুভ বললো -- না যাইনি।
-- এবার না গেলে মা-বাবা মাইন্ড করবে না ?
-- এই চিন্তা বাদ। বাবা-মা বেঁচে নাই।
শুভর এই কথায় ছোঁয়া আরো নিশ্চিত হয়ে উঠলো। তবু জিজ্ঞেস করলো -- সেক্ষেত্রে তোমার ভাই-বোনেরা তো আছে। তারা কি চিন্তায় থাকবে না ?
শুভ এবার হেসে উঠলো। বললো -- আপনি নিশ্চয়ই আমাকে চিনে ফেলেছেন। সব জেনেও আমার মুখ থেকে এসব শুনতে চাইছেন।
-- তোমাকে আর কি চিনবো ? তোমাকে তো আগে থেকেই চিনি, জানি।
-- আমার ফেসবুক আইডির কথা বলছি। আমার পোস্ট না পড়লে ঠিকানা ভুলে যাওয়ার কথা বলতে পারতেন না।
-- তুমি তো কেবল নিজেকেই চালাক ভাবো। মনে কর, অন্যেরা সবাই মাথায় গোবর নিয়ে ঘুরে।
-- না, সেটা ভাববো কেন ?
-- কেন ভাবো, সেটা আমি কিভাবে বলবো ? তোমার সাথে কি মেসেঞ্জারে আমার কথা হয় মাঝে মধ্যে ?
শুভ এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠে বললো -- এ তো হয়ই। আমি আপনাকে প্রথমেই চিনেছি এবং আপনার পোস্টগুলো ভালো লাগতো বলেই রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম।
ছোঁয়া বলে উঠলো -- এসব তো জানাই হলো। এখন বল, বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টারভিউ কার্ড পেয়েছো কিনা।
এ কথায় শুভর মুখ শুকিয়ে একেবারে কাঠ। অজানা আশঙ্কায় কি বলবে খুঁজে পাচ্ছে না। আমতা আমতা করতে লাগলো। এতে ছোঁয়াই আবার বলে উঠলো -- কেন, তোমার পোস্টের কমেন্টে দেখলাম, একজনে তোমাকে বাংলাদেশ ব্যাংকে দরখাস্ত করার বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছে। তোমার উত্তরও তো আমি দেখেছি।
শুভ এবার মিথ্যে বললো -- ওহ্, সেটা আমরা দুই বন্ধুতে ঠাট্টা করেছি।
ওর দরখাস্তটা যে স্বচক্ষে দেখেছে, সেটা গোপন রেখে ছোঁয়া বললো -- এতদিন জানতাম, তুমি মিথ্যা বল না। আজ দেখছি, আমার ধারণা ভুল।
শুভ লজ্জা পেলো। তার কণ্ঠে মিনতির সুরে উচ্চারিত হলো -- ম্যাডাম, ধরা যেহেতু পড়েই গেছি, মিথ্যা বলে লাভ নাই। আপনাদের বাড়িতে আমার আশ্রয়ও নিশ্চয়ই শেষ হয়ে গেছে। তাই অনুরোধ, আমাকে আর কিছুদিন এখানে থাকতে দেন, প্লীজ। আমি একটা কাজের খোঁজ করে নেই। বিশ্বাস করুন, ঢাকায় আশ্রয় নেয়ার মত আর কোনো জায়গা আমার নাই।
ছোঁয়ার কণ্ঠে বিস্ময় ঝরে পড়লো -- আশ্রয়ের কথা বলছো কেন ? এখান থেকে তোমার চলে যেতে হবে, এটা কে বললো ?
-- আপনাদের দৃষ্টিতে আমি তো ফাঁকিবাজ হয়ে গেছি। মিথ্যা বলে চাকরি নিয়েছি।
-- কি মিথ্যা বলেছো তুমি ?
-- ঐতো, নিজেকে অষ্টম শ্রেণি পাস বলে চাকরি নিয়েছি।
-- এ-তো তুমি জীবন যুদ্ধে একটা কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছো। কারো ক্ষতি করার জন্য না।
শুভ কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে উঠলো। বললো -- তবু এটা অন্যায়।
-- না, একে আমি অন্যায় ভাবি না। তবে বারবার নিজেকে গোপন করে ঠিক করোনি।
শুভকে নীরব দেখে ছোঁয়া আরো বলে চললো -- আমিও তো পড়াশোনা করছি। জীবন সংগ্রামে কাউকে সহযোগিতা করতে পারলে নিজেকে ধন্যই মনে হবে। সেক্ষেত্রে তোমাকে নিরুৎসাহিত করবো কেন ?
শুভ এবার পূর্ণ আশ্বস্ত হয়ে বললো -- সত্যি বলছেন ম্যাডাম ?
-- আমি তোমার মত মিথ্যুক না। আমি যা বলি, সত্যই বলি। আর তুমি আমার সিনিয়র। আমাকে 'আপনি' করে বলতে হয় কেন ?
শুভর মুখে বিনয়ের হাসি ফুটে উঠলো। বললো -- আপনারা মনিব। আমি আপনাদের চাকরি করি।
-- এ বিষয়ে আমি তোমার সাথে একমত না। আমি সম্পদের মাপকাঠিতে মানুষ মাপি না। আজকের বিত্তহীন যে কালকে বিত্তবান হবে না, এমন তো কোনো বিধানে উল্লেখ নাই।
শুভকে নীরব দেখে ওর যোগ্যতা জানা সত্বেও ছোঁয়া আবার জিজ্ঞেস করলো-- তোমার শিক্ষাগত যোগ্যতা কি জানতে পারি ?
শুভ এবার সত্যি কথাই বললো -- আমি দুই বছর আগে বাংলায় অনার্স মাস্টার্স শেষ করেছি।
-- এই তো, তোমার যোগ্যতাও আমার চেয়ে অনেক বেশী। তাহলে নিজেকে ছোট ভাবার কি আছে ?
একটু থেমে ছোঁয়া আবার বললো -- সেদিন লিখেছো, তোমার ভাইয়েরা তোমাকে উপড়ে ফেলে দিয়েছে। এই বিষয়টা খুব জানতে ইচ্ছে করে। বলতে সমস্যা আছে কি ?
শুভ অনেকটা সাহসী হয়ে উঠেছিলো। তাই জীবনের কষ্টকর অধ্যায়ের বর্ণনা দিয়ে চললো।
পাঁচ ছেলে রেখে প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার বাবা দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে তার মাকে গ্রহণ করেন। তাকে দুই বছরের রেখে কিভাবে তার মায়ের মৃত্যু হয়। এরপরে তার বাবা কেন আর বিয়ে করেননি। কেন তার বাবার আন্তরিক চেষ্টা সত্বেও ভাইদের কেউ পড়াশোনা করতে পারেনি। দুই বছর আগে তার বাবা মারা যাওয়ার পরে কিভাবে ভাইয়েরা তাকে হিংসা করতে শুরু করে। ভাইদের দাবী, তাদের বাবা নাকি তার পড়াশোনার জন্যই সংসারের সমস্ত টাকা খরচ করেছেন। তাদের জন্য সেটা করেননি। তাই বাবার সম্পত্তির অংশ তাকে দেবে না। এমনকি এক সময় বাড়িতে থাকাটাও তার জীবনের উপর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এতে বাধ্য হয়ে সে ঢাকায় এসে চাকরি নিয়েছে।
এসব কথা ছোঁয়ার হৃদয়েও নাড়া দিয়ে গেলো। বললো -- তুমি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছো। দুনিয়াতে সম্পদটাই বড় না। প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে সম্পদের অভাব হয় না।
একটু নীরব থেকে আরো বললো -- কোন টেনশন নাই। তোমার চেষ্টা তুমি চালিয়ে যাও।
পরে ফিরে আসার সময় বললো -- তোমার কাছে তো নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কোনো বই নাই। আমাদের ঘরে অনেক ভালো ভালো বই আছে। নিয়ে যেয়ো।
রাতে খাবার টেবিলে ছোঁয়া পরিবারের সবার কাছে শুভর বিষয়টা প্রকাশ করে দিলো। এতে আজিম সাহেব সেদিনের আসাদুজ্জামান নামে ডেকে পরীক্ষা করার ঘটনাটাও প্রকাশ করলেন। আলোচনায় ছোঁয়া শুভর পারিবারিক জটিলতার কথাটা তুলে ধরলে সবাই সহানুভূতি প্রকাশ করলো। নাসরিন জাহান তো স্বামীর কাছে ওর চাকরিটাই দাবী করে বসলেন। তবে আজিম সাহেব এতে সায় দিতে পারেননি। তিনি হেসে বললেন -- সরকারি চাকরির বিষয় কিন্তু আলাদা। ইচ্ছা করলেই সেটা কাউকে দেয়া যায় না। ও যদি লিখিত পরীক্ষায় টিকতে পারে, তখন ভাইভার সময় কিছুটা সহযোগিতা আমি করতে পারবো।
মোটকথা, মেয়ের বর্ণনায় শুভর প্রতি নাসরিন এমনই সহানুভূতিশীল হয়ে উঠলেন যে, স্বামীর কাছে তিনি বিকল্প ব্যবস্থায় হলেও ওর চাকরিটা পাইয়ে দেয়ার দাবি জানালেন।
এতে আজিম সাহেব বললেন-- আমার উপরেও অফিসার আছেন। আমার কথা তো তারা না-ও রাখতে পারেন। তার চেয়ে বরং আমার বিষয়ে শুভকে জানানোর দরকার নাই। লিখিত পরীক্ষায় ভালো করতে বলো। ওদিকে আমিও চেষ্টা করে দেখি, কিছু করা যায় কি না।
শেষ পর্যন্ত আজিম সাহেবের কথাতেই সিদ্ধান্ত। রাতে শুভ খেতে এলে নাসরিন জাহান নিজে ওর খাবার দিলেন। উদ্দেশ্য, ওর সম্পর্কে আরো কিছু জেনে নেবেন। শুভ খেতে বসলে ছোঁয়া বলে উঠলো -- তোমাকে বই নিতে বলেছিলাম। নিলে না কেন ?
শুভ বুঝতে পারলো, তার সবকিছুই এখানে প্রকাশ হয়ে গেছে। তাই একটু ভেবে বললো -- আমি গুগল থেকে ডাউনলোড করে পড়ি।
ছোঁয়া বললো -- সেটা তো খরচের ব্যাপার। তারচে তুমি বই নিয়েই পড়তে পারো।
এর পৃষ্ঠে কিছু না বলে শুভ খেতে শুরু করেছে। নাসিরন জাহানও সামনের দিকের একটা চেয়ারে বসে শুভর প্লেটে মাংস তুলে দিতে দিতে তার পারিবারিক বিষয়ে কথা তুললেন। আজিম সাহেব বাইরে বেরিয়ে যাওয়ায় একান্ত পারিবারিক পরিবেশে কথাবার্তা চলছে। পিয়া যখন মায়ের পাশে বসে আলোচনা শুনছে, ছোঁয়া তখন আলমারি খুলে সাধারণ জ্ঞানের তিনটি বই বের করে এনে বললো -- বই তিনটা নিয়ে যেয়ো। আমি কালকে তোমার জন্য "কারেন্ট এফেয়ার্স" আর "কারেন্ট ওয়ার্লড" সংগ্রহ করে আনবো।