শরীয়তপুর প্রতিনিধি : ‘ইচ্ছেতো অনেক আপাতত যদি জীবন থেকে পালিয়ে যেতে পারতাম।।’ মৃত্যুর ১৬ ঘণ্টা পূর্বে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এই স্ট্যাটাসটি দিয়েছিলেন মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড পড়ে নিহত ব্যক্তি আবুল কালাম। কে জানতো এই ইচ্ছার আড়ালে তার জীবনটাও চিরতরে পালিয়ে যাবে।
আবুল কালামের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর ইউনিয়নের ঈশ্বরকাঠি গ্রামে। তাঁর এমন অকালমৃত্যু মানতে পারছেন না স্বজন ও গ্রামের মানুষেরা।
কিশোর বয়সেই বাবা–মাকে হারিয়েছিলেন আবুল কালাম। এরপর ভাই-বোনদের সংসারে বেড়ে ওঠেন। কঠোর পরিশ্রম করে সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে চেষ্টা করছিলেন। পরিবারের প্রিয় মানুষটি মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মারা গেছেন।
ঈশ্বরকাঠি গ্রামের জলিল চোকদার ও হনুফা বেগম দম্পতির ছেলে আবুল কালাম। চার ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে আবুল কালাম ভাইদের মধ্যে সবার ছোট। ২০ বছর আগে তাঁর বাবা ও মা মারা যান। এরপর তিনি বড় হন বড় ভাই ও বোনদের কাছে।
সংসারের স্বাচ্ছন্দ্য ফেরাতে ২০১২ সালে মালয়েশিয়ায় যান আবুল কালাম। সেখান থেকে ফিরে ২০১৮ সালে পাশের গ্রামের আইরিন আক্তারকে বিয়ে করেন। দাম্পত্য জীবনে তাঁদের ছয় বছরের এক ছেলে ও চার বছর বয়সী এক মেয়েসন্তান রয়েছে। স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে আবুল কালাম নারায়ণগঞ্জের পাঠানটুলী এলাকায় বসবাস করতেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তন ছাত্র ঢাকার মতিঝিলের একটি ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে কাজ করতেন। ওই কাজের জন্যই প্রতিদিন তিনি নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা যাতায়াত করতেন।
প্রতিদিনের মতো রোববার সকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে মতিঝিলে আসেন আবুল কালাম। এরপর কাজের জন্য সেখান থেকে বের হন। আজ দুপুর সোয়া ১২টার দিকে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের পিলারের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে যায়। সেটির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান আবুল কালাম। এরপর গণমাধ্যমের সংবাদে পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
নড়িয়া উপজেলা সদরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কীর্তিনাশা নদী। নদীর তীরের ঈশ্বরকাটি গ্রামটি উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে। গ্রামের বাড়িতে চার ভাইয়ের টিনের চারটি বসতঘর রয়েছে। একটি ঘরে থাকতেন আবুল কালাম। সেই ঘরটি তালাবদ্ধ।
নিহতের মেঝভাবি আছমা বেগম বলেন, ‘দুপুর ১২টার দিকে আবুল কালামের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়েছে। সে বলছিল দু-এক দিনের মধ্যে বাড়িতে আসবে এবং আমি যেন ইলিশ মাছ কিনে রাখি। আমার ভাই আর আসলো না!
নিহতের চাচাতো ভাই আব্দুল গণি চোকদার বলেন, ‘আবুল কালাম খুব পরিশ্রমী ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ ছিলেন। নিজের চেষ্টায় ঢাকায় ব্যবসা দাঁড় করিয়েছিলেন। এমন আকস্মিক মৃত্যু আমাদের জন্য এক অসম্ভব বেদনার বিষয়। সরকারের অবহেলার কারণে আমার ভাই মারা গেল। এখন তার পরিবারে দায় দায়িত্ব কে নেবে?’
উল্লেখ্য, মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে নিহত আবুল কালামের পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক ও রেল উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। এছাড়া তার পরিবারের সব দায়-দায়িত্ব মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে। সেই সাথে পরিবারের মধ্যে কর্মক্ষম ব্যক্তিকে মেট্রোরেলে চাকরি দেওয়া হবে হবে বলেও জানিয়েছেন সড়ক ও রেল উপদেষ্টা।
রিপোর্টার্স২৪/আরকে