| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

নবীদের নগরী: যেখানে তিন ধর্মের মিলন

reporter
  • আপডেট টাইম: ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫ ইং | ২৩:২৭:৫৪:অপরাহ্ন  |  110056 বার পঠিত
নবীদের নগরী: যেখানে তিন ধর্মের মিলন
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত ছবি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: তুরস্কের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের শহর শানলিউরফা (Şanlıurfa) ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম এই তিন ধর্মের অনুসারীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান।

তুরস্কের দক্ষিণ–পূর্বে অবস্থিত শানলিউরফার শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গের ছায়ায় নীলাভ পানির পুকুরে সোনালি রঙের কালো দাগওয়ালা কার্প মাছ সাঁতার কাটে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে মেসোপটেমিয়ার রাজা নেমরুত বিন কেনান যখন নবী ইব্রাহিমকে (ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কাছে যিনি আব্রাহাম নামে পরিচিত) আগুনে নিক্ষেপ করেন, তখনই এই মাছগুলোর সৃষ্টি হয়।

মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে এক আল্লাহর অস্তিত্ব ঘোষণা করায় ইব্রাহিম নেমরুতের বিরাগভাজন হন। নিজেকে দেবতা মনে করা নেমরুতের কাছে ইব্রাহিম ছিলেন বড় বাধা। তাই তাঁকে হত্যা করতেই হবে এমনটাই ছিল রাজার সিদ্ধান্ত। সমতলের ওপরে দৃশ্যমান দুটি রোমান স্তম্ভ সেই ঘটনার স্থান নির্দেশ করে।

নামের ভেতরের ইতিহাস

সিরিয়া সীমান্ত থেকে প্রায় ৪০ মাইল উত্তরে অবস্থিত শানলিউরফা একসময় উচ্চ মেসোপটেমিয়ার অংশ ছিল এবং বহু সভ্যতার আবাসস্থল। প্রতিটি সভ্যতাই শহরটির ওপর নিজেদের ছাপ রেখে গেছে।

আরামীয় গোত্রসংঘ শহরটির নাম দিয়েছিল উরহাই। সেলিউসিড রাজবংশ (খ্রিস্টপূর্ব ৩১২ থেকে ৬৪ সাল পর্যন্ত) একে ডাকত এডেসা নামে। সপ্তম শতকে আরব বিজয়ের পর এর নাম হয় রোহা। ষোড়শ শতকে অটোমানরা শহরটি দখল করে এবং ১৬০৭ সালে নাম পরিবর্তন করে উরফা রাখে।

১৯৮৪ সালে শহরের নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘শানলি’, যার অর্থ ‘গৌরবময়’। ট্যুর গাইড মুরাত তানরিতানির বলেন, তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শহরবাসীর প্রতিরোধের স্বীকৃতি হিসেবেই এই নামকরণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনীর দখলের বিরুদ্ধে স্থানীয়রা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

‘নবীদের নগরী’

শানলিউরফা পরিচিত ‘নবীদের শহর’ নামে। ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মে শ্রদ্ধেয় এই নগরীর সঙ্গে নবী ইব্রাহিম, আইয়ুব (জব), শোয়াইব (জেথ্রো) ও নুহ (নোয়াহ)-এর নাম জড়িয়ে আছে।

মুসলিম তীর্থযাত্রীরা পুরোনো শহরের দারগাহ মসজিদ কমপ্লেক্সে ভিড় করেন। সবুজ গালিচার মতো ঘাস, গোলাপ ঝোপ ও ছায়াঘেরা গাছপালায় ঘেরা এই কমপ্লেক্সের কেন্দ্রবিন্দু হলো বালিক্লিগোল যাকে বলা হয় ‘মাছের হ্রদ’। এটি আসলে দুটি পুকুর, যেখানে শত শত কালো দাগওয়ালা কার্প মাছ রয়েছে।


বড় পুকুরটির নাম হালিল-উর-রাহমান। এখানেই নেমরুত ইব্রাহিমকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। কাহিনি অনুযায়ী, আল্লাহ আগুনকে পানি আর কাঠকে মাছ বানিয়ে দেন। মাছের শরীরের কালো দাগগুলো নাকি সেই আগুনের ছাইয়ের চিহ্ন।

ছোট পুকুরটির নাম আইনজেলিহা, নেমরুতের কন্যা জেলিহার নামে। তিনি ইব্রাহিমের অনুসারী ছিলেন এবং আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

স্থানীয় কৃষক মেহমেত কায়া বলেন, বালিক্লিগোল ভ্রমণ সবসময় আবেগঘন। এটা শুধু পর্যটন স্থান নয়, এটি নবী ইব্রাহিমের গল্পের সঙ্গে যুক্ত এক পবিত্র স্থান। মানুষ এখানে দোয়া করতে আসে, পবিত্র মাছকে খাবার দেয় এবং এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করে।

পবিত্র গুহা

তীর্থযাত্রীরা নবী ইব্রাহিমের জন্মগুহা মেভলিদ-ই-হালিল মাগারায় ভিড় করেন। বিশ্বাস অনুযায়ী, নেমরুতের স্বপ্নের কারণে ইব্রাহিমের জীবন তখনই হুমকির মুখে পড়ে, যখন তিনি মায়ের গর্ভে। পুরোহিতদের ভবিষ্যদ্বাণীর পর নেমরুত সেই বছরের সব নবজাতক হত্যার নির্দেশ দেন।

ইব্রাহিম বেঁচে যান এবং একটি গুহায় জন্ম নিয়ে সাত বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই লালিত-পালিত হন।

আজও নারীরা এখানে সন্তান লাভের আশায় বা রোগমুক্তির বিশ্বাসে পবিত্র ঝর্ণার পানি সংগ্রহ করতে আসেন। গুহার ভেতর কোরআন তেলাওয়াত, জপমালা হাতে প্রার্থনা সব মিলিয়ে এক গভীর আধ্যাত্মিক পরিবেশ।

ইতিহাস নতুন করে লেখা

শানলিউরফার ইতিহাস ধর্মীয় গ্রন্থেরও বহু আগের। শহরের উত্তর–পূর্বে অবস্থিত গোবেকলিতেপে, প্রায় ১১ হাজার বছরের পুরোনো এক নিওলিথিক স্থাপনা। এটি এমন এক সময়ের নির্মাণ, যখন মানুষ কৃষি বা মৃৎশিল্পও জানত না।


ট্যুর গাইড তানরিতানির বলেন,এটি আমাদের সভ্যতা সম্পর্কে ধারণাই বদলে দিয়েছে। মনে হয় ধর্মীয় আচার কৃষির আগেই এসেছে।

এখানে আবিষ্কৃত টি-আকৃতির বিশাল স্তম্ভগুলোতে পশুর খোদাই রয়েছে। গোবেকলিতেপের আবিষ্কার স্টোনহেঞ্জকেও তুলনামূলকভাবে আধুনিক মনে করায়।

খাবার ও জীবনধারা

শানলিউরফা কেবল ইতিহাস নয়। কায়া বলেন,উরফাকে বুঝতে হলে স্থানীয়দের সঙ্গে বসে ধীরে ধীরে চা খেতে হবে।

ঢাকা বাজারের মতো ব্যস্ত কাপালি চারশি বা ঢাকা বাজারে পাওয়া যায় পোশাক, শুকনো ফল, তামার বাসন, কার্পেট ও ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী।

সন্ধ্যায় শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে কাবাবের সুবাস। উরফা কাবাব বিখ্যাত, বিশেষ করে পাতলিজান কাবাব (বেগুন কাবাব)। এছাড়া রয়েছে চিগ কফতে ও মিষ্টান্ন শিল্লিক তাতলিসি।

সাংস্কৃতিক স্পন্দন

এখানে প্রচলিত ‘সিরা গেজেসি’ রাতভিত্তিক সাংস্কৃতিক আড্ডা, যেখানে গান, কবিতা, খাবার ও সামাজিক বন্ধন একসঙ্গে উদযাপিত হয়।

তানরিতানির বলেন,এটা কোনো পর্যটন শো নয়। এটি উরফার সাংস্কৃতিক হৃদস্পন্দন।শানলিউরফার প্রধান মসজিদ উলু জামে, নির্মিত দ্বাদশ শতকে। এখানে মানুষ শুধু নামাজ পড়তেই আসে না কেউ বিশ্রাম নেয়, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে। তানরিতানির ভাষায়,শানলিউরফা যেন এক জীবন্ত জাদুঘর। এখানে অতীত ও বর্তমান পাশাপাশি বাস করে।

সিএনএন  /রিপোর্টার্স২৪/এসসি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪