| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

খালেদা জিয়া জাতির ‘ঐক্যের প্রতীক’

reporter
  • আপডেট টাইম: জানুয়ারী ০৫, ২০২৬ ইং | ১৮:৪০:৫৮:অপরাহ্ন  |  58395 বার পঠিত
খালেদা জিয়া জাতির ‘ঐক্যের প্রতীক’
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত ছবি

মিতা রহমান

মানুষ মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু এরই মাঝে কিছু মৃত্যু পাহাড়ের চেয়েও ভারী মনে হয়। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুটাও অনেকটা তাই। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আগমন, দীর্ঘ নয় বছর স্বৈরাচারী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন, আপসহীন দেশনেত্রীতে রূপান্তর, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়া, ১/১১-এর মইনউদ্দিন–ফখরুদ্দিনের সঙ্গে আপস না করে দেশের মাটিতে অবস্থান, বিগত প্রায় ১৭ বছর স্বৈরাচারী শাসকের প্রতিহিংসার শিকার হয়েও আপস না করে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জাতীয় বীরের সম্মানে ভূষিত হওয়া—সবকিছুই একটি কালের অধ্যায়। পৃথিবীতে খুব কম রাজনৈতিক নেতৃত্বই এই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

সকল শ্রেণি, সকল মতের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিই সব বলে দিয়েছে। গত বুধবার তাঁর জানাজায় লাখো মানুষের জনস্রোত ছিল মানুষের ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। তারা এসেছিলেন নিজেদের ভেতরের এক তাগিদ থেকে, এমন একজন মানুষকে শ্রদ্ধা জানাতে, যাকে তারা নিজেদেরই প্রতিনিধি মনে করতেন। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে এ দেশের মানুষের এই বন্ধন যেন ছিল রাজনীতির ঊর্ধ্বে। তাঁর জানাজায় আসা সবাই দলীয় নেতাকর্মী ছিলেন না। অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ মানুষ। কীভাবে তিনি এত সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিলেন, তা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। ইতিহাসের এক কালজয়ী অধ্যায়।

এত সংগ্রাম ও ত্যাগের পরও জীবদ্দশায় প্রাপ্য সম্মান দেখাতে পারেনি রাষ্ট্র ও জাতি। সাত বছরেরও বেশি সময় তাঁকে কারান্তরীণ ও গৃহবন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়েছে—যা ছিল আইনের অপব্যবহারের এক নগ্ন দৃষ্টান্ত। তিনবারের নির্বাচিত এই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বন্দিদশায় যে আচরণ করা হয়েছে, তা ছিল মর্যাদাহানিকর। দুই বছরের বেশি সময় তাঁকে নির্জন কারাবাসে রাখা ছিল নিষ্ঠুর ও অমানবিক।

একজন গৃহবধূ ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। স্বামী ও দেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর সাত মাস পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। রাজনীতিতে আসার ১০ বছরের কম সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। প্রায় ৪৩ বছর তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকের সমন্বয়। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন এক দৃঢ়চেতা, সাহসী নেত্রী। তিনি বিপদে-দুর্যোগে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন। আর শেষ জীবনে তিনি হয়ে ওঠেন জাতির ‘ঐক্যের প্রতীক’।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়ার মতে,“মূলত সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রচণ্ড রকমের একটি শক্ত ভিত্তি ও ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তার পরবর্তী ১/১১ প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে সময় তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে এতটাই সমর্থ হন যে তাঁর উচ্চতা অনেককেই হার মানিয়েছে। আপসহীন রাজনৈতিক চরিত্রের কারণেই শেষ জীবনে এসে তিনি দল-মতনির্বিশেষে সবার কাছে সম্মান ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন।”

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি একসঙ্গে একাধিক আসনে নির্বাচন করেছেন, কিন্তু কখনো পরাজিত হননি। যখন যেখানে দাঁড়িয়েছেন, তুমুল জনপ্রিয়তায় ভর করে সেখান থেকে জয়ের মালা নিয়েই ফিরেছেন। কিন্তু ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে থামতে হলো জীবনের পথে। ৮০ বছর বয়সে এসে থেমে গেল বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিঃশ্বাস। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো তাঁর রাজনৈতিক জীবন। কিন্তু অপরাজেয়ই থাকলেন রাজনীতির মাঠে।

বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, উত্তাল অধ্যায় স্থায়ীভাবে ইতিহাসের পাতায় স্থান নিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রাজপথের রাজনীতি হারাল তার অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বরকে, আর জাতি হারাল এমন এক নেত্রীকে যিনি দেশ ও জনগণের জন্য পুরো জীবন ব্যয় করেছেন। তাঁর বিদায় মানে শুধু একজন রাজনীতিকের মৃত্যু নয়; এটি এক যুগের পরিসমাপ্তি।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশ, দেশের জনগণ, এমনকি বিশ্ব এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। দেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সংগ্রাম, সাহস, অকৃত্রিম দেশপ্রেম, সততা ও নীতিনিষ্ঠতার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁকে ছাড়া একটি বাংলাদেশ কল্পনা করা আমার জন্য কঠিন। ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে খালেদা জিয়ার পরিবারের ওপর চরম নির্যাতন নেমে আসে। তাঁর দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয় এবং খালেদা জিয়াকেও কারাবরণ করতে হয়। শত চাপের মুখেও তিনি আপস করেননি, বিদেশ যেতে রাজি হননি এবং বরং উচ্চ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশই আমার শেষ ঠিকানা।’

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘আপসহীন’ শব্দটি এখন আর কেবল একটি বিশেষণ নয়; বরং এই শব্দটি একটি নামের সমার্থক হয়ে উঠেছে—বেগম খালেদা জিয়া।

(লেখক: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাপ ও আহ্বায়ক, জাতীয় নারী আন্দোলন)


[ আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল। এই বিভাগে লেখকের ‘মতামত’ একান্তই তার নিজস্ব; যার দায়ভার রিপোর্টার্স২৪ বহন করে না। ধন্যবাদ]

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪