| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

হাতিরঝিলের দুর্গন্ধময় পানি: নান্দনিকতার আড়ালে এক নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট

reporter
  • আপডেট টাইম: জুন ২২, ২০২৬ ইং | ১৮:৩৪:৪৪:অপরাহ্ন  |  ৩০৪৬ বার পঠিত
হাতিরঝিলের দুর্গন্ধময় পানি: নান্দনিকতার আড়ালে এক নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট

সীমান্ত আরিফ : ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হাতিরঝিল শুধু একটি জলাধার বা যোগাযোগ ব্যবস্থা নয়; এটি রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো, বিনোদন কেন্দ্র এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের প্রতীক। প্রতিদিন হাজারো মানুষ হাতিরঝিলের সড়ক ও নৌপথ ব্যবহার করেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত দর্শনার্থীরাও এই এলাকাকে ঢাকার আধুনিক নগরায়ণের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে দেখে থাকেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে হাতিরঝিলের পানির দুর্গন্ধ এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে এটি এখন শুধু পরিবেশগত নয়, একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

প্রতিদিন শত শত মানুষ হাতিরঝিলের ওয়াটার বাস বা জলপথ ব্যবহার করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করছেন। কিন্তু যাত্রাপথে তাদেরকে সহ্য করতে হচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ। অনেক যাত্রী অভিযোগ করছেন যে পানির দুর্গন্ধের কারণে নৌযাত্রার সময় শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা এবং অস্বস্তি অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।

প্রশ্ন হলো, একটি আধুনিক নগর প্রকল্পের পানির মান কীভাবে এমন অবস্থায় পৌঁছাল?

পরিবেশবিদদের মতে, জলাধারে অপরিশোধিত বর্জ্য, নর্দমার পানি এবং বিভিন্ন ধরনের দূষণকারী উপাদান প্রবেশের ফলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। এর ফলে পানিতে জৈব পদার্থ পচে গিয়ে হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিভিন্ন গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা দুর্গন্ধের প্রধান কারণ। দীর্ঘদিন ধরে যদি এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে, তবে শুধু পানির গুণগত মানই নষ্ট হয় না, পুরো জলজ পরিবেশ ব্যবস্থাও ধ্বংসের মুখে পড়ে।

হাতিরঝিলের চারপাশে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করেন। তারা প্রতিনিয়ত এই দূষিত পরিবেশের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। দুর্গন্ধযুক্ত পানি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস ও জীবাণু বায়ুর মাধ্যমে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, অ্যালার্জি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই নগর জলাধারের দূষণকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, হাতিরঝিল রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মানুষ যখন এখানে এসে দুর্গন্ধযুক্ত পানি ও দূষিত পরিবেশের মুখোমুখি হন, তখন এটি শুধু একটি প্রকল্পের ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং ঢাকার সামগ্রিক নগর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে।

হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়নে রাষ্ট্র বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। এই বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য ছিল নগরবাসীকে একটি স্বাস্থ্যকর, নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব নগর পরিবেশ উপহার দেওয়া। কিন্তু যদি পানির মান রক্ষা করা না যায়, তাহলে প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।

এখন সময় এসেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের। প্রথমত, হাতিরঝিলের পানির গুণগত মান নিয়মিত পরীক্ষা করে তার ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোথা থেকে দূষিত পানি বা বর্জ্য হাতিরঝিলে প্রবেশ করছে তা চিহ্নিত করে দ্রুত বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, পানির প্রবাহ ও পরিশোধন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে জলাধারে স্থবিরতা তৈরি না হয়। চতুর্থত, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা ওয়াসা এবং হাতিরঝিল কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে একটি দীর্ঘমেয়াদি দূষণ নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

জনগণেরও সচেতনতা জরুরি। হাতিরঝিলকে পরিচ্ছন্ন রাখা শুধু কর্তৃপক্ষের একার দায়িত্ব নয়; এটি নগরবাসীরও দায়িত্ব। তবে নেতৃত্ব ও উদ্যোগ অবশ্যই আসতে হবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছ থেকে।

হাতিরঝিল ঢাকার গর্ব। কিন্তু এই গর্ব যদি দুর্গন্ধের আড়ালে হারিয়ে যেতে থাকে, তবে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। তাই আমরা হাতিরঝিল কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার প্রতি জোরালো আহ্বান জানাই—দুর্গন্ধময় পানি ও দূষণের এই সমস্যাকে অবহেলা না করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। কারণ এটি শুধু একটি জলাধারের সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং রাজধানীর মর্যাদার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি জাতীয় গুরুত্বের বিষয়।

হাতিরঝিলকে বাঁচানো মানে শুধু একটি প্রকল্পকে বাঁচানো নয়; বরং একটি সুস্থ, বাসযোগ্য ও আধুনিক ঢাকার স্বপ্নকে রক্ষা করা। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই নীরব সংকেতকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন।

লেখক : সীমান্ত আরিফ, এমফিল গবেষক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
রিপোর্টার্স/সাইফ

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪