আন্তর্জাতিক ডেস্ক: কালো পোশাকে নীরব গম্ভীরতা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় সেই দৃশ্যই চোখে পড়ে। ঢাকায় আয়োজিত জানাজায় উপস্থিত ছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। সেখানে তিনি সাক্ষাৎ করেন খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে।
জানাজা শেষে তারেক রহমানের হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো শোকবার্তা তুলে দেন জয়শঙ্কর। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন‘বেগম খালেদা জিয়ার দর্শন ও মূল্যবোধ আমাদের দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বকে এগিয়ে নিতে দিকনির্দেশনা দেবে।’
এই বক্তব্য অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। কারণ কয়েক দশক ধরে খালেদা জিয়া ও বিএনপির রাজনীতির প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সন্দেহপ্রবণ, এমনকি প্রকাশ্য বিরোধিতাপূর্ণ।
অতীতের বৈরিতা থেকে বর্তমানের ‘রিসেট’
১৯৯০-এর দশক থেকে ভারত স্পষ্টভাবেই আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে তার ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে দেখেছে। বিপরীতে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক জোট, পাকিস্তানঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি এবং সীমান্ত ও নিরাপত্তা ইস্যুতে কঠোর অবস্থান সব মিলিয়ে দিল্লির চোখে বিএনপি ছিল অস্বস্তিকর এক শক্তি।কিন্তু পরিস্থিতি বদলেছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। এই বাস্তবতায় ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিনিয়োগ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের আগে ভারত বুঝতে পারছে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানিয়ে নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও বদলে যাওয়া বার্তা
১৭ বছর নির্বাসন শেষে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ঢাকায় নামার পরই তিনি যে বক্তব্য দেন, তা আগের বিএনপির চেনা ভাষার চেয়ে ভিন্ন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র,সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও সাবেক হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা মনে করেন,দীর্ঘ নির্বাসনে থেকে তারেক রহমান রাজনৈতিকভাবে পরিণত হয়েছেন। তিনি বুঝেছেন, ভারতের সঙ্গে বৈরিতা রেখে সরকার চালানো সম্ভব নয়।
জামায়াত ছাড়াই বিএনপি: দিল্লির স্বস্তি
এই মুহূর্তে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হলো—বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোট ভেঙে যাওয়া। জামায়াত এখন ছাত্র আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের পাকিস্তানপন্থী অবস্থান ও ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে দিল্লির কাছে বিএনপি এখন তুলনামূলকভাবে ‘গ্রহণযোগ্য বিকল্প’।
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন,অতীতের বোঝা সত্ত্বেও ভারতের কাছে তারেক রহমানই এখন সবচেয়ে নিরাপদ বাজি।
ভারতের হিসাব, বিএনপির হিসাব ভারতের দৃষ্টিতে—
জামায়াত ও উগ্র ছাত্র রাজনীতির উত্থান ভারতীয় স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ,তারেক রহমান জনপ্রিয় এবং নির্বাচনের পর স্থিতিশীল সরকার দিতে পারেন,বিএনপির সঙ্গে কাজ করলে অন্তত সীমান্ত ও নিরাপত্তা ইস্যুতে নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব।
অন্যদিকে বিএনপির হিসাব: ভারতবিরোধী আবেগ এখনো জনমনে প্রবল,কিন্তু দিল্লির প্রকাশ্য বিরোধিতা থাকলে ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন,তাই প্রয়োজন ভারতকে দূরে না ঠেলে, তবে সমান দূরত্বে রাখা।তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির স্পষ্ট ভাষায় বলেন,বাংলাদেশ আর কখনো কারও ‘পোষা কুকুর’ হবে না। বাংলাদেশ ফার্স্ট এই নীতিতেই আমরা চলব।
হাসিনা ইস্যু: বড় বাধা থেকেই যাচ্ছে
তবে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা শেখ হাসিনা। বিএনপি নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ক্ষমতায় এলে তারা ভারতের কাছে হাসিনার প্রত্যর্পণ চাইবে। হুমায়ুন কবির বলেন,ভারত যদি হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে যায়, তাহলে জনগণের ভারতবিরোধী মনোভাবের কারণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।
এই ইস্যুতে দিল্লি এখনো নীরব, যা ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। কেবল কূটনীতি নয়, মাঠেও উত্তাপ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব পড়ছে জনজীবনেও।
সম্প্রতি ভারতের আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সকে বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে না রাখতে চাপ দেয় বিজেপি-ঘনিষ্ঠ মহল—যা দুই দেশের জনমনে নতুন করে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
সামনে কী?
বিশ্লেষকদের মতে,বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে বাস্তববাদী সমঝোতা দেখা যেতে পারে,তবে পাকিস্তান, সীমান্ত নিরাপত্তা ও হাসিনা প্রত্যর্পণ—এই তিন ইস্যু সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই এই ‘নতুন অধ্যায়’ কি সত্যিকারের আস্থা তৈরি করবে, নাকি কেবল কৌশলগত সাময়িক বিরতি হিসেবেই থেকে যাবে?
রিপোর্টার্স২৪/এসসি