আন্তর্জাতিক ডেস্ক: অক্টোবর মাসে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় চালানো ইসরায়েলি হামলায় অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ হামলায় আহত হয়েছেন আরও সাতজন। স্থানীয় চিকিৎসা সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
রোববার (১১ জানুয়ারি) ভোর পর্যন্ত চালানো এসব হামলায় গাজার দক্ষিণাঞ্চলের রাফাহ ও খান ইউনুস, গাজা সিটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেইতুন এলাকা এবং উপত্যকার অন্যান্য কয়েকটি মহল্লা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় বলে জানানো হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবরোধের মধ্যে থাকা গাজায় ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে এক ফিলিস্তিনি ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় একটি ইসরায়েলি কোয়াডকপ্টার ড্রোন থেকে হামলা চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এ ছাড়া ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, গাজা সিটির জেইতুন এলাকার পূর্বাংশে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে আরও দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তারেক আবু আজ্জুম বলেন, এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও দ্রুতগতির উত্তেজনার সময়। আমরা মধ্য গাজা সিটি ও পূর্বাঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলি ড্রোনের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। যুদ্ধবিরতির তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ অতিক্রম করেও হামলা চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রাফাহ, খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চল এবং জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে ব্যাপকভাবে ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব কার্যক্রম মূলত দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি আলোচনায় চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে অধিক এলাকা সামরিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কৌশল বলে মনে হচ্ছে।
তারেক আবু আজ্জুমের ভাষায়, যেসব এলাকায় আগে থেকেই বেসামরিক মানুষ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেখানে ভবন ধ্বংস ও হামলা চালানো হচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠছে এগুলো কি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নাকি যুদ্ধবিরতির আড়ালে ভূখণ্ড পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা?
এদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী শনিবার এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, দক্ষিণ ও উত্তর গাজার কয়েকটি এলাকায় তাদের বাহিনীর জন্য হুমকি সৃষ্টি করায় তিন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন ইসরায়েলি সামরিক সরঞ্জাম চুরি করছিল বলেও দাবি করা হয়।
তবে গাজা থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে এই ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রচণ্ড শীতে শিশু মৃত্যুর ঘটনা
এদিকে গাজায় ভয়াবহ মানবিক সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রবেশে বাধার মধ্যে শনিবার সাত দিনের এক নবজাতক শিশু প্রচণ্ড শীতে মারা গেছে।
চিকিৎসা সূত্র জানায়, মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় মাহমুদ আল-আকরা নামের ওই শিশু মারা যায়। সাম্প্রতিক দিনে গাজায় রাতের তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
এটি আবহাওয়ার সংকট নয়, মানবসৃষ্ট বিপর্যয়
গাজা সিভিল ডিফেন্স এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, নিম্নচাপের প্রভাবে হাজার হাজার অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও তাঁবু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা একটি ভয়াবহ বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংস্থাটির মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন,যা ঘটছে, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার সরাসরি ফল। মানুষ ছেঁড়া তাঁবু ও ফাটলধরা ঘরে কোনো নিরাপত্তা বা মর্যাদা ছাড়াই বসবাস করছে।
ধ্বংসস্তূপে গাজা
জাতিসংঘের তথ্যমতে, গাজায় গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি আগ্রাসনে প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে কয়েক লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে এবং মানবিক সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি