রিপোর্টার্স২৪ডেস্ক: সৌদির অর্থ, পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি ও তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা মিলিয়ে গঠনের পথে ‘ইসলামিক ন্যাটো’।সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে গড়ে ওঠা একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হতে তুরস্কের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত এই নিরাপত্তা জোটের কাঠামো অনেকটাই উত্তর আটলান্টিক জোট (ন্যাটো)-এর সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা নীতি বা ‘আর্টিকেল–৫’-এর আদলে তৈরি করা হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনকে পুরো জোটের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।
বার্তাসংস্থা ব্লুমবার্গ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রথমে রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা এই উদ্যোগ এখন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নিয়ে আঙ্কারার দিকে এগোচ্ছে। সম্ভাব্য দায়িত্ব বণ্টনের কাঠামো অনুযায়ী সৌদি আরব দেবে আর্থিক সহায়তা,পাকিস্তান যুক্ত করবে তাদের পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও জনবল,আর তুরস্ক দেবে সামরিক দক্ষতা ও নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা।
আঙ্কারাভিত্তিক থিংক ট্যাংক টেপাভ (TEPAV)-এর কৌশলবিদ নিহাত আলি ওজচান এ তথ্য জানিয়েছেন।
ওজচান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন ক্রমশ নিজের কৌশলগত স্বার্থ ও ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তখন আঞ্চলিক সংঘাতের পরিবর্তিত বাস্তবতা দেশগুলোকে নতুন ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশগুলো নতুনভাবে বন্ধু ও প্রতিপক্ষ চিহ্নিত করছে।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের কৌশলগত স্বার্থ ক্রমেই কাছাকাছি আসছে। এ কারণেই একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা জোট গঠনকে স্বাভাবিক ও যৌক্তিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে তিন দেশ ঘনিষ্ঠ সামরিক সমন্বয়ের দিকেও এগোচ্ছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে আঙ্কারায় প্রথমবারের মতো তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের যৌথ নৌবাহিনী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই সম্ভাব্য জোটের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় এ কারণে যে, তুরস্ক কেবল আরেকটি আঞ্চলিক শক্তি নয়। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র–নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের পর ন্যাটোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী তুরস্কের।
সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে ইরানকে ঘিরে কিছু অভিন্ন উদ্বেগ রয়েছে। যদিও উভয় দেশই সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে তারা একটি স্থিতিশীল, সুন্নি নেতৃত্বাধীন সিরিয়া এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে একমত।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বহুদিনের। তুরস্ক ইতোমধ্যে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর জন্য করভেট যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ, পাকিস্তানের এফ–১৬ যুদ্ধবিমান বহরের আধুনিকায়ন, এবং সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে ড্রোন প্রযুক্তি ভাগাভাগি করছে। এ ছাড়া তুরস্ক তাদের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ (KAAN) প্রকল্পে সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলেও আগে জানিয়েছিল ব্লুমবার্গ।
এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা আলোচনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে চার দিনব্যাপী সামরিক উত্তেজনার পর ওই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ওই সংঘাতটি ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত, যেখানে তুরস্ক প্রকাশ্যভাবে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা মুসলিম বিশ্বের ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচনা করতে পারে যাকে অনেকেই অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি