আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা চালানো হলে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে আসছেন। সম্প্রতি তিনি ইরানি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেছেন‘সাহায্য আসছে’, যা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও জল্পনা তৈরি করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই ইরানে হস্তক্ষেপ করে, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে কী কী সামরিক বিকল্প রয়েছে? সেগুলো কতটা বাস্তবসম্মত?
ট্রাম্প কী বলেছেন?
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Truth Social-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন:
‘ইরানি দেশপ্রেমিকরা, প্রতিবাদ চালিয়ে যান। প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নিন। যারা হত্যা ও নির্যাতন করেছে, তাদের নাম সংরক্ষণ করুন,তারা বড় মূল্য দেবে। বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সব বৈঠক বাতিল। সাহায্য আসছে। MIGA!”
এখানে MIGA (Make Iran Great Again)— ট্রাম্পের ‘Make America Great Again’ স্লোগানের আদলে দেওয়া একটি রাজনৈতিক বার্তা।
এর আগে, ২ জানুয়ারি ট্রাম্প আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন,ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষা করতে আসবে। আমরা প্রস্তুত।’
তবে এই ‘সাহায্য’ বা হস্তক্ষেপের ধরন সম্পর্কে তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি।
ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান কী?
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কারোলিন লেভিট জানান, কূটনীতি এখনও ট্রাম্পের প্রথম পছন্দ হলেও প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারে তিনি দ্বিধা করবেন না।
তিনি বলেন, ‘এয়ারস্ট্রাইকসহ বহু সামরিক বিকল্প টেবিলে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট চাইলে যে কোনো সময় তা ব্যবহার করতে পারেন।’
২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইসরায়েল ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে অবস্থিত ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল,যা প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে।
এখন পরিস্থিতি ভিন্ন কেন?
২০২৫ সালের সেই যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। তবে বর্তমানে তা কমে এসেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ USS Gerald Ford এখন মধ্যপ্রাচ্যে নেই। এটি বর্তমানে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে—
ক্যারিবীয় থেকে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছাতে লাগবে প্রায় ১০ দিন,সেখান থেকে পারস্য উপসাগরে যেতে লাগবে আরও ৭ দিন। অর্থাৎ, দ্রুত পূর্ণমাত্রার হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি এখন আগের মতো নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি কোথায় আছে?
যুক্তরাষ্ট্র এখনও মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ১৯টি সামরিক স্থাপনা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ৮টি স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে; বাহরাইন
কাতার (আল উদেইদ—সবচেয়ে বড় ঘাঁটি)
সৌদি আরব
কুয়েত
সংযুক্ত আরব আমিরাত
জর্ডান
ইরাক
মিসর
রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটি থেকে কিছু মার্কিন সেনাকে সাময়িকভাবে সরানো হয়েছে। যদিও এটিকে ‘পূর্ণমাত্রার প্রত্যাহার’ নয়, বরং ‘posture change’ বলা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের যুদ্ধে ইরান এই ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল।ইরানের নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প সাধারণত স্বল্পমেয়াদি, লক্ষ্যভিত্তিক এবং কম ঝুঁকির সামরিক অভিযান পছন্দ করেন।
অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদেহ বলেন,সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড কিংবা ভেনেজুয়েলায় মাদুরো অপহরণ এসবই ট্রাম্পের স্টাইলের উদাহরণ।’
ট্রাম্প আগেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইকে ‘সহজ লক্ষ্য’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে,খামেনেই নিহত হলে আইআরজিসি (রেভল্যুশনারি গার্ড) ক্ষমতা নিতে পারে।
এতে ইরান আরও সামরিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ আরও তীব্র হতে পারে
এটি ওয়াশিংটনের জন্য বিপজ্জনক ফল বয়ে আনতে পারে।
স্থল হামলা (Ground Invasion) কি সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে না, প্রায় অসম্ভব।
‘ট্রাম্প একজন nation-builder নন। তিনি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বা সেনা মোতায়েন চান না,’
ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ট্রাম্প প্রশাসন চায় না। তাই ইরানে স্থল হামলার সম্ভাবনা খুবই কম।
তাহলে সম্ভাব্য চিত্র কী?
বিশ্লেষকদের মতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পদক্ষেপ হতে পারে—
সীমিত বিমান হামলা
সাইবার আক্রমণ
নির্দিষ্ট সামরিক বা রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন স্ট্রাইক
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি; তবে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ বা দখল অভিযান নয়।
উপসংহার
ইরানে চলমান বিক্ষোভ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ হলেও, সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতিটি বিকল্পেই রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি। ট্রাম্পের হুমকি বাস্তবে রূপ নেবে কিনা, তা নির্ভর করছে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ওপর।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি