আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানে সামরিক হামলা চালানো হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে,এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। এই সতর্কবার্তার পর আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি ঘাঁটি থেকে কিছু মার্কিন সেনা ও কর্মী প্রত্যাহার শুরু করেছে ওয়াশিংটন।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) এক মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেন। একই দিন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্কসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হবে এ মর্মে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আগাম জানানো হয়েছে।
কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটি থেকে কর্মী সরানো শুরু
তিন কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি যা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সামরিক ঘাঁটি সেখান থেকে কিছু কর্মীকে বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ সেনা প্রত্যাহার নয়।
এক কূটনীতিক এ পদক্ষেপকে ‘পূর্ণাঙ্গ সরিয়ে নেওয়া নয়, বরং সামরিক অবস্থান পুনর্বিন্যাস (posture change)’ হিসেবে বর্ণনা করেন। গত বছর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে যেভাবে বড় আকারে সেনা সরানো হয়েছিল, এবার তেমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে না।
ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের হুমকি, ইসরায়েলের মূল্যায়ন
ইসরায়েলি এক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েলের গোয়েন্দা মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে কখন এবং কী পরিসরে এই হস্তক্ষেপ হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এর আগে ট্রাম্প একাধিকবার প্রকাশ্যে ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে হস্তক্ষেপের হুমকি দেন। মঙ্গলবার CBS News-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুবই শক্ত প্রতিক্রিয়া’ দেখাবে। একই সঙ্গে তিনি ইরানিদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
নজিরবিহীন বিক্ষোভ, বাড়ছে প্রাণহানি
গত দুই সপ্তাহ ধরে ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা হিসেবে দেখছে দেশটি ও পশ্চিমা বিশ্ব। অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
ইরানি এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা দুই হাজার ৬০০ ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা HRANA জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৪০৩ জন বিক্ষোভকারী ও ১৪৭ জন সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে। একই সঙ্গে ১৮ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোকে বার্তা, যোগাযোগ স্থগিত
ইরানের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র যাতে ইরানে হামলা চালাতে না পারে সে জন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতি চাপ সৃষ্টি করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে চলমান প্রত্যক্ষ যোগাযোগ সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে।
সরকার টিকে আছে, তবে চাপে: পশ্চিমা বিশ্লেষণ
এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেছেন, এত বড় পরিসরের বিক্ষোভ ইরানি সরকারকে চাপে ফেললেও এখনই সরকারের পতনের আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে না। নিরাপত্তা বাহিনী এখনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম।
তবে ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত থাকায় ইরানের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরকারপন্থী সমাবেশ ও নিহতদের জানাজার দৃশ্য নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে বলেন,‘যতদিন জনগণের সমর্থন থাকবে, ততদিন দেশের বিরুদ্ধে শত্রুদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।’
রিপোর্টার্স২৪/এসসি