আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে যে, ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী একটি জোটের নেতৃত্ব দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে জনমত জরিপ ও রাজনৈতিক সমীকরণে দলটির উত্থান দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফরিদপুরের ৪৫ বছর বয়সী ব্যাংকার আবদুর রাজ্জাক জীবনে প্রথমবার বিশ্বাস করছেন, যে দলটি তিনি সমর্থন করেন,সে দল জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় যেতে পারে। নিজ এলাকায় দলটির ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি যাদের সঙ্গে কথা বলছি, তারা সবাই একমত ভোট যাবে জামায়াতেই।
নির্বাচন প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এটি হবে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর প্রথম নির্বাচন।
অভ্যুত্থানের পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে। ফলে এবারের নির্বাচন কার্যত দুই মেরুতে বিভক্ত একদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন একটি জোট। এই জোটে রয়েছে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি), যা ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের দ্বারা গঠিত, এবং আরও কয়েকটি ইসলামপন্থী দল।
সাম্প্রতিক জরিপগুলো জামায়াতের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের ডিসেম্বরের এক জরিপে দেখা যায়, বিএনপির সমর্থন ৩৩ শতাংশ, জামায়াতের ২৯ শতাংশ। চলতি মাসে বাংলাদেশের একাধিক গবেষণা সংস্থার জরিপে বিএনপি পেয়েছে ৩৪.৭ শতাংশ, জামায়াত ৩৩.৬ শতাংশ প্রায় সমান অবস্থান।
দমন-পীড়ন থেকে পুনরুত্থান
জামায়াতের সম্ভাব্য উত্থান হলে তা হবে এক নাটকীয় পালাবদল। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দলটি নিষিদ্ধ ছিল, শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি বা কারাদণ্ড দেওয়া হয়, আর হাজারো নেতা-কর্মী গুম বা হেফাজতে নিহত হন।
এই দমন-পীড়ন শুরু হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে, যা ২০১০ সালে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে গঠিত হয়েছিল। যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, তবু জামায়াতের তৎকালীন শীর্ষ নেতারা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, একই ট্রাইব্যুনাল ২০২৫ সালের নভেম্বরে ২০২৪ সালের আন্দোলনে দমন-পীড়নের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তিনি বর্তমানে ভারতে আশ্রয়ে রয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ সত্ত্বেও এখনো তাকে প্রত্যর্পণ করেনি ভারত।
জামায়াতের ইতিহাস ও রাজনৈতিক যাত্রা
১৯৪১ সালে ইসলামি চিন্তাবিদ সৈয়দ আবুল আলা মওদুদীর হাতে প্রতিষ্ঠিত জামায়াত উপমহাদেশে একটি সর্বভারতীয় ইসলামি আন্দোলন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার বিরোধিতা করায় ১৯৭২ সালে দলটি নিষিদ্ধ হয়। পরে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
১৯৯১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোট করে জামায়াত সরকারে অংশ নেয়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে জামায়াতের দুই নেতা মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন। তবে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় ফেরার পর দলটি আবার কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
বর্তমান নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক শক্তি
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে জামায়াত দ্রুত সংগঠিত হয়। বর্তমানে দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন আমির ডা. শফিকুর রহমান, নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
দলটির দাবি, তাদের সমর্থক সংখ্যা প্রায় দুই কোটি এবং নিবন্ধিত সদস্য (রুকন) আড়াই লাখের মতো। সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাফল্যও দলটির সাংগঠনিক শক্তির ইঙ্গিত দিয়েছে।
ইসলামপন্থী সরকার নিয়ে উদ্বেগ
জামায়াতের উত্থান নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, দলটি ক্ষমতায় গেলে শরিয়াভিত্তিক আইন চাপিয়ে দিতে পারে কিংবা নারী ও সংখ্যালঘু অধিকার সংকুচিত হতে পারে।
তবে জামায়াত নেতারা এসব আশঙ্কা নাকচ করেছেন। নায়েবে আমির তাহের বলেন, আমরা দেশের সংবিধানের আলোকে শাসন করব। প্রয়োজন হলে সংস্কারের মাধ্যমে নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।
তিনি জামায়াতকে মধ্যপন্থী ইসলামি দল হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, দলটি আদর্শিক চাপ নয়, সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশ পরিচালনায় বিশ্বাসী।
প্রথমবারের মতো জামায়াত একজন হিন্দু প্রার্থী খুলনার কৃষ্ণ নন্দীকে মনোনয়ন দিয়েছে, যা সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের নির্বাচনী ফলাফল ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্যও একটি পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিয়ান বলেন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার হলে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন বিএনপির তুলনায় কঠিন হবে।
তবে শেখ হাসিনার পতনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ বাণিজ্য, কূটনীতি ও যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা জামায়াত সমর্থকদের আশাবাদী করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন আদর্শগত লড়াইয়ের চেয়ে শাসনব্যবস্থা ও সংস্কারের প্রশ্নে বেশি নির্ধারিত হবে।
রিপোটার্স ২৪/এসসি