আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গৃহযুদ্ধকবলিত মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত ধাপে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। রোববার (২৫ জানুয়ারি) দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ভোটকেন্দ্র খোলার মধ্য দিয়ে শেষ দফার নির্বাচন শুরু হয়। ব্যাপক সমালোচনার মুখে আয়োজিত এই নির্বাচনে সামরিক বাহিনীসমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) জয় পেতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের সরাসরি রাজনৈতিক ভূমিকায় যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
এর আগে ২৮ ডিসেম্বর ও ১১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রথম দুই ধাপে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ, যা ২০২০ ও ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
রোববার ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়সহ ৬০টি টাউনশিপে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ, পশ্চিমা দেশগুলো এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো নির্বাচনটিকে সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত করার একটি প্রহসন হিসেবে অভিহিত করলেও জান্তা সরকার দাবি করছে, নির্বাচনের মাধ্যমে আগামী এপ্রিলের দিকে একটি নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। এতে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বেসামরিক সরকার উৎখাত হয়।
৮০ বছর বয়সী অং সান সু চি এখনও আটক রয়েছেন। তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিসহ (এনএলডি) বেশ কয়েকটি বিরোধী দলকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে জান্তা সরকার। এতে সামরিক সমর্থিত ইউএসডিপির জন্য রাজনৈতিক মাঠ আরও অনুকূল হয়ে ওঠে।
এদিকে আসিয়ানভুক্ত দেশ মালয়েশিয়া জানিয়েছে, তারা মিয়ানমারের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেবে না। মালয়েশিয়া গত বছর ১১ সদস্যের আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের সভাপতির দায়িত্বে ছিল।
ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের প্রধান এশিয়া বিশ্লেষক কাহো ইউ বলেন,
পঞ্চম বছরে গড়ানো সংকটের সমাধান তো হচ্ছেই না, বরং এই নির্বাচন সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা আরও শক্ত করবে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ বৈধতা ফেরার কিংবা পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনাও খুব কম।
নির্বাচনী প্রচারণা ও আগের দফার ভোটের সময়ও মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ চলেছে। রাখাইন, শান ও কায়িন রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বেসামরিক এলাকায় বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ইউএসডিপি নিম্নকক্ষে ২০৯টির মধ্যে ১৯৩টি এবং উচ্চকক্ষে ৭৮টির মধ্যে ৫২টি আসনে জয় পেয়েছে। ফলে দলটি সংসদে সুস্পষ্ট প্রাধান্য অর্জন করেছে।
২০১০ সালে গঠিত ইউএসডিপি এর আগে পাঁচ বছর দেশ শাসন করেছিল। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং দলে সাবেক বহু উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা রয়েছেন।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী গত ছয় দশকের মধ্যে পাঁচ দশকই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে দেশ শাসন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
গত সপ্তাহে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং বলেন,সরকার পরিবর্তিত হলেও তাতমাদাও (মিয়ানমারের সেনাবাহিনী) জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব বহন করে যাবে।
৬৯ বছর বয়সী এই জেনারেল সেনাপ্রধান হিসেবে উত্তরসূরি নিয়োগের কথা ভাবছেন এবং নিজে পূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকায় যেতে পারেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
যদিও জান্তা সরকার কম ভোটার উপস্থিতির মধ্যেও নির্বাচনকে সফল বলে দাবি করছে, তবে ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ের বাসিন্দারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, অনেকেই গ্রেপ্তার বা প্রতিশোধের ভয়ে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছেন।
নির্বাচন সুরক্ষা আইনের আওতায় ভোটের সমালোচনা ও বাধা দেওয়ার অভিযোগে ৪০০ জনের বেশি মানুষকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।রয়টার্স
রিপোটার্স ২৪/এসসি