- আহমেদ শাহেদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থান নিছক একটি ক্ষমতার পালাবদল নয়। এটি ছিল স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একটি নতুন প্রজন্মের রাষ্ট্রচিন্তার বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘদিনের একদলীয় চরিত্রের সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। শুরুতে এই সরকারকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও আশাবাদ জন্মেছিল- বিশ্বাস ছিল, এই সরকার অন্তত অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেবে এবং একটি গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তা প্রতিষ্ঠা করবে।
কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বছরও শেষ হয়নি এরমধ্যেই ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশ’ সংশোধনের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্তটি সামনে এসেছে, তা কেবল হতাশাজনক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় চিন্তার গভীর আত্মবিরোধিতা প্রকাশ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শহীদ এম মনসুর আলী, কামারুজ্জামান সহ প্রবাসী সরকারের কেন্দ্রীয় নেতাদের এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচিত এমএনএ-এমপিএদের মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তাঁদের ‘সহযোগী’ হিসেবে অভিহিত করা, আদতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রাজনৈতিক রঙে পুনর্লিখনের এক ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ।
মুক্তিযুদ্ধ মানেই কি কেবল বন্দুক হাতে যুদ্ধের মাঠে থাকা? একটি স্বাধীনতা সংগ্রামে কেবল ফিজিক্যাল লড়াই নয়, কৌশল, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টি, সাংগঠনিক নেতৃত্ব- সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি না হতেন, তবে কি যুদ্ধ এমন সংগঠিত হতো? তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রবাসী সরকার যদি সংগঠনের কাঠামো তৈরি না করতেন, যুদ্ধ কি এই সাফল্যে পৌঁছাতো?
এই নেতারা কেবল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন- তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত স্থপতি। যুদ্ধ পরিচালনার বৈধ কাঠামো, বৈদেশিক সহায়তা সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝানো যে এটি একটি গণমানুষের স্বাধীনতা যুদ্ধ- এসবই তো তাঁদের নেতৃত্বে হয়েছিল। ‘সহযোগী’ বলার মধ্য দিয়ে আসলে তাঁদের ভূমিকা খাটো করা হচ্ছে না, বরং রাষ্ট্র নিজেই নিজের ইতিহাসকে অস্বীকার করছে।
এই অধ্যাদেশ কেবল একটি প্রশাসনিক ভুল নয়- এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রকল্প, যার উদ্দেশ্য হলো জাতির স্মৃতি ও পরিচয়ের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। অতীতে পাকিস্তানি সেনাশাসকরা যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল ন্যারেটিভ মুছে দিতে চেয়েছিল, তখন তারা প্রথমেই আঘাত করেছিল ইতিহাসের ওপর। তারা ৭ মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ করেছিল, বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ দিয়েছিল, ২৬ মার্চকে অস্বীকার করেছিল। আজ যদি স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারও সেই একই পথে হাঁটে- বঙ্গবন্ধুকে ‘সহযোগী’ বলে, প্রবাসী সরকারকে ‘গৌণ শক্তি’ আখ্যা দেয়, তাহলে কেবল শাসক বদলেছে, চরিত্র নয়।
এই অধ্যাদেশ মূলত নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার একটি প্রকল্প। কারণ, একটি শিশু যখন স্কুলে পড়বে, তখন তাকে যদি শেখানো হয়- “বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ করেননি, কেবল সমর্থন করেছিলেন”- তাহলে সে ভবিষ্যতে নিজের ইতিহাসকে কীভাবে গড়বে?
শেখ হাসিনার শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, কোটা আন্দোলনে গুলি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়ে সাংবাদিক দমন- এসব ছিল রাষ্ট্রীয় স্বৈরতন্ত্রের চিহ্ন। সেই স্বৈরাচারের পতনের পর যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এল, তাদের কাছ থেকে আশা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভিত্তি করে একটি গণমুখী প্রশাসন গড়ে উঠবে। কিন্তু ইতিহাসের মেরুকরণ, রাষ্ট্রীয় স্মৃতিচিহ্ন নিয়ন্ত্রণ, মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রেণিবিন্যাসের মতো কাজ করে তারা যেন সেই পুরনো প্রবণতাকেই পুনরুজ্জীবিত করছে।
এখানে প্রশ্ন জাগে- এই সরকার কি কেবল মুখোশ বদলেছে, নাকি নীতিগত দিক থেকেও ভিন্ন কিছু চিন্তা করতে চায়? যদি না চায়, তবে সেই গণ-অভ্যুত্থান কোন পরিবর্তনের কথা বলেছিল?
একটি যুদ্ধ শুধু যোদ্ধাদের নয়- পুরো জাতির অংশগ্রহণে সম্ভব হয়। সাংবাদিক সেলিনা পারভীন, যাঁকে পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করেছিল, তিনি কি মুক্তিযোদ্ধা নন? স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীরা, যাঁরা বাঙালির মনোবল ধরে রেখেছিলেন, তাঁদের ভূমিকা কীভাবে 'সহযোগী' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়?
লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেছেন- তাঁদের ভূমিকা, আত্মত্যাগকে শুধুই ‘সহযোগী’ বলার মানসিকতা আসলে একটি সংকীর্ণ সামরিকীকৃত চিন্তার প্রতিফলন। এটি যুদ্ধ মানেই কেবল গুলি চালানো- এই ভুল ধারণার ধারাবাহিকতা।
যখন একটি রাষ্ট্র নিজেই তার আত্মপরিচয়ের ভিত্তি- মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস- নিয়ে আত্মঘাতী কাজ করে, তখন তা কেবল রাজনৈতিক ভুল নয়, জাতিগত আত্মঘাত। জামুকা অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকার যে কাজটি করতে চাইছে, তা হলো ইতিহাসের গায়ের গড়ন পাল্টে দেওয়া, সেই ইতিহাসকে শ্রেণিকরণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক ‘নির্বিষ স্মৃতি’তে অভ্যস্ত করে তোলা।
এটি মূলত একটি রাষ্ট্রের নিজ ইতিহাসের ওপর আরোপিত নিপীড়ন।
মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি সময়কাল নয়- এটি একটি চেতনা, একটি দর্শন। সেই চেতনায় নেতৃত্বের গুরুত্ব, রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা, আদর্শের ভূমিকা অস্বীকার করলে, যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসই বিকৃত হয়। এই অধ্যাদেশ যদি বহাল থাকে, তাহলে কেবল কয়েকজন ব্যক্তি বা পরিবারের অপমান নয়- এটি গোটা জাতির আত্মপরিচয়ের উপর আঘাত।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন এই জাতির মুক্তির প্রতীক। তাঁকে ‘সহযোগী’ বলার মানে ইতিহাসের মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলা।
এই অধ্যাদেশ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রাজনীতির হাত থেকে মুক্ত করতে হবে। ইতিহাসকে শ্রেণিকরণ নয়, সম্মান ও সত্যের ভিত্তিতে সংরক্ষণ করতে হবে।
যদি একটি গণ-অভ্যুত্থানের ফসল হয়ে আসা সরকারই মুক্তিযুদ্ধকে খণ্ডিত করে, মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রেণিবদ্ধ করে, ইতিহাসের কণ্ঠ রোধ করে- তাহলে সেই গণজাগরণের প্রকৃত অর্থ কী? এক স্বৈরাচারী শাসকের জায়গায় আরেকটি বর্ণচোরা শাসন যদি আসে, তাহলে ইতিহাস তা ভুলবে না।
জাতির মুক্তি কেবল সরকার বদলে আসে না- চেতনার বদলে আসে, রাষ্ট্রচিন্তার বদলে আসে। সেই চিন্তার বিকাশ না হলে, শাসকের চেহারা বদলালেও কাঠামোটি থাকবে একই।
তাই প্রশ্নটা এখন জাতির সামনে- আমরা কি সত্যিই স্বাধীনতার চেতনার ধারক, নাকি কেবল তার নাম ব্যবহার করে নতুন রকমের নিপীড়ন তৈরি করছি?
লেখক: কলাম লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী