রিয়াজুল হক:
প্রাচীন কালের কথা, 'অল্প টাকার অভাব মানুষকে কষ্ট দেয়, আর অতিরিক্ত টাকার প্রাচুর্য তাকে অন্ধ করে।' আজকের সমাজে দাঁড়িয়ে এই কথাটি যে কতটা সত্য, তা আমরা প্রতিদিনের জীবনে প্রতিনিয়ত দেখতে পাই। টাকার প্রাচুর্য কেবল একজন ব্যক্তিকে বিলাসিতায় মোহিত করে না, অনেক সময় তাকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, বানিয়ে ফেলে আত্মকেন্দ্রিক ও অহংকারী। অর্থ মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় উপাদান, কিন্তু এই প্রয়োজন যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা চরিত্রের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আমাদের চারপাশে তাকালেই দেখা যায়, যেসব মানুষ অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, তাদের একটা বড় অংশের মধ্যে একটি ভিন্নরকম মনোভাব তৈরি হয়ে গেছে। তারা মনে করেন, টাকার জোরেই তারা সমাজের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। বিনয়ের জায়গায় আসে আত্মগর্ব, সহানুভূতির জায়গা দখল করে নেয় আত্মকেন্দ্রিকতা। অনেকেই নিজেদের অজান্তেই অন্যদের ছোট করে দেখা শুরু করেন। অন্যদের জীবনসংগ্রাম, আবেগ বা মর্যাদার প্রতি তাদের এক ধরনের উপেক্ষা দেখা যায়। এই মানসিকতা শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কেই নয়, সামাজিক ও পেশাগত ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অর্থবান মানুষদের একাংশের আচরণে একটি বিষয় খুবই সাধারণ হয়ে উঠেছে। 'আমি কত টাকা খরচ করেছি', এই কথার মাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করে থাকে। তাদের কাছে, অর্থ ব্যয়ই মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড। অথচ, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব আসে বিনয়, সহানুভূতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে।
অন্যদিকে, অনেকেই আবার টাকার প্রাচুর্যের কারণে আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার হন। তারা ভাবেন, যেহেতু আমার ব্যাংক ব্যালান্স বড়, আমি সফল। এই 'সাফল্যের’ ধারণা তাদের মনুষ্যত্বকে সংকুচিত করে দেয়। সমাজ, পরিবেশ কিংবা মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা তাদের কাছে অবান্তর হয়ে ওঠে। ফলে সমাজে একধরনের বিভক্তি তৈরি হয়, 'ধনী বনাম বাকি সবাই'।
এমন অবস্থায় প্রশ্ন আসতে পারে, সব দোষ কী তবে টাকার? না, টাকা নিজে কোনো সমস্যা নয়। এটি একটি মাধ্যম মাত্র, যা মানুষকে প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করে। কিন্তু যখন মানুষ এই মাধ্যমকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে ফেলে, তখনই বিপদ শুরু হয়। সমস্যা হয় তখন, যখন টাকা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
বিশ্বজুড়ে বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে টাকার মোহ মানুষের ধ্বংস ডেকে এনেছে। কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, এসবের পেছনে আছে টাকার অসংযত লালসা। কিন্তু এর চেয়েও ভয়াবহ হলো, যখন টাকার প্রাচুর্য মানুষকে এমন আত্মবিশ্বাস দেয় যে সে মনে করে, তার কোনো ভুল নেই, কিংবা তাকে কোনোকিছুর জন্য উত্তর দিতে হতে হবে না।
আমাদের সমাজেও আজকাল এমন ‘নতুন ধনী’ শ্রেণির উত্থান হয়েছে, যাদের অহংকার চোখে পড়ে। তারা বিলাসবহুল গাড়ি, দামি পোশাক, ভিআইপি আচরণকে নিজেদের পরিচয়ের অংশ বানিয়ে ফেলেছে। অনেকে আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই প্রাচুর্য প্রদর্শন করে সাধারণ মানুষের সামনে এক ধরনের অতৃপ্তি ও হীনমন্যতা সৃষ্টি করে। এই প্রবণতা সমাজে বৈষম্য ও ক্ষোভ বাড়ায়।
আমরা যদি আমাদের গ্রামীণ সমাজের দিকে তাকাই, দেখা যাবে, এখনও সেখানে অনেক মানুষ স্বল্প আয়ে সৎভাবে জীবনযাপন করে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে বিনয়, সহমর্মিতা ও আন্তরিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। অর্থের অভাবে হয়তো তাদের জীবন কঠিন, কিন্তু চরিত্রে তারা ধনবান।
অহংকার পতনের মূল, এটা অত্যন্ত প্রচলিত একটি প্রবাদ। আর এই অহংকারের জন্ম হয় তখনই, যখন মানুষ নিজেকে অন্যদের চেয়ে বেশি ভাবতে শুরু করে। টাকার প্রাচুর্য সেই ভাবনার একটি প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে।
তবে সব ধনী মানুষ অহংকারী নন, এই সত্যটিও ভুলে গেলে চলবে না। অনেকেই আছেন যারা প্রচুর অর্থ থাকা সত্ত্বেও বিনয়ী, মানবিক ও দায়বদ্ধ। তারা জানেন, অর্থ একটি দায়িত্ব, এর সঠিক ব্যবহার করতে হয়।
তাই সমাধান হলো চর্চার মধ্যে। পারিবারিক শিক্ষায় শেখানো উচিত, তোমার যা আছে, তা অন্য কারো অধিকার খর্ব করে নয় বরং তোমার প্রাচুর্য অন্যের কল্যাণে ব্যবহৃত হোক। তবে টাকার প্রাচুর্য অহংকারী বানাবে না।
আমাদের প্রয়োজন একটি মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ গঠন, যেখানে সাফল্যের মানদণ্ড হবে শুধু অর্থ নয়, সাথে থাকবে মানবতা, বিনয়, চরিত্র ও দায়বদ্ধতা। একমাত্র তখনই টাকার প্রাচুর্য মানুষকে অহংকারী না করে আরও সহানুভূতিশীল করে তুলবে। কারণ, দিনশেষে মানুষকে মনে রাখা হয় তার কর্মের মধ্য দিয়ে, টাকার পরিমাণ দিয়ে নয়।
লেখকঃ রিয়াজুল হক
যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক