সুলতানা আইভি :
আজ ৫ই জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য 'প্লাস্টিক দূষণ শেষ করো' (Ending Plastic Pollution)। এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন প্লাস্টিকের ভয়াবহতা রোধে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলা। দক্ষিণ কোরিয়া এবার বিশ্বজুড়ে এই দিবসের আয়োজক দেশ হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছে, যারা প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে একটি পূর্ণ জীবনচক্র কৌশল গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশের জন্য এই প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের সাথে সাথে বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ২০১০ সালের তুলনায় পাঁচগুণ বাড়বে। প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণে বিশ্বে বাংলাদেশ ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে বলে এক প্রতিবেদন জানিয়েছে। শহরের ড্রেন, নদী, খাল এবং ফসলি জমিতে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এটি শুধু মাটি ও পানি দূষণই নয়, মানব স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ও বাংলাদেশের দুর্বলতা:
প্লাস্টিক দূষণের পাশাপাশি বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হওয়া বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সামান্য উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে। দেশের বিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চল এবং নদীবাহিত বদ্বীপীয় চরিত্র বাংলাদেশকে আরও বেশি অরক্ষিত করে তুলেছে। উপরন্তু, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বায়ু ও পানি দূষণকে এক ভয়াবহ মাত্রায় নিয়ে গেছে। ঢাকা শহরের বাতাস প্রায়শই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় থাকে।
বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও কর্মপরিকল্পনা:
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: জাতীয় সেমিনার ও আলোচনা সভা: পরিবেশ সুরক্ষায় করণীয়, প্লাস্টিক দূষণ রোধে উদ্ভাবনী সমাধান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের অংশগ্রহণে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে।
ব্যাপক বৃক্ষরোপণ অভিযান: সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা হবে। স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে এই কর্মসূচিকে উৎসাহিত করা হবে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি: প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব এবং এর বিকল্প ব্যবহারের বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হবে। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ বার্তা প্রচার করা হবে।
নদী ও জলাশয় পরিষ্কার অভিযান: দেশের নদী ও খালগুলোতে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণে বিশেষ অভিযান পরিচালনার সম্ভাবনা রয়েছে।
টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও পুনঃব্যবহার উৎসাহিত করার পাশাপাশি "রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল" নীতি বাস্তবায়নে জোর দেওয়া হবে।
বিদ্যালয় ও কলেজে কর্মসূচি: শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরিতে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক ও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মত ও করণীয়:
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল একদিনের কর্মসূচিতে পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে সরকার, শিল্প মালিক, বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
কঠোর আইন ও প্রয়োগ: প্লাস্টিকের উৎপাদন, ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন এবং এর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের (Single-use plastic) ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিকল্পের ব্যবহার উৎসাহিত করা: পরিবেশবান্ধব বিকল্প পণ্য, যেমন- পাটের ব্যাগ, কাগজের মোড়ক, কাঁচের বোতল ইত্যাদির ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে হবে।
পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য পৃথকীকরণ: প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ এবং পুনর্ব্যবহারের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনে আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন জরুরি।
নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির (সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ইত্যাদি) ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়: পরিবেশ সুরক্ষায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৫ আমাদের জন্য এক নতুন করে ভাবার এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। প্লাস্টিক দূষণের মতো মারাত্মক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ যদি এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে। সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সবুজ, সুস্থ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়া সম্ভব, যেখানে পরিবেশের সুরক্ষা হবে আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।