| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

‘ঝুঁকিহীন’ পয়লা বৈশাখেও জোরদার নিরাপত্তা

reporter
  • আপডেট টাইম: এপ্রিল ১২, ২০২৬ ইং | ১৭:৫২:১৩:অপরাহ্ন  |  ৫৭৫০২ বার পঠিত
‘ঝুঁকিহীন’ পয়লা বৈশাখেও জোরদার নিরাপত্তা

স্টাফ রিপোর্টার: আগামী মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বাংলা নতুন বছরে পদার্পন করবে বাংলাদেশ। পুরোনোকে বিদায় দিয়ে নতুন স্বপ্ন আশা আর সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আসছে এই দিন।

দেশজুড়ে বর্ণিল আয়োজন, মঙ্গল শোভাযাত্রা আর সাংস্কৃতিক আবহে উদযাপিত হবে বাঙালির ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের এই অনন্য উৎসব। মানুষের মনে জাগাবে নবচেতনা ও সম্প্রীতির বন্ধন।

বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ ঘিরে প্রতি বছরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা প্রস্তুতি চোখে পড়ে। কোনো নির্দিষ্ট ঝুঁকির আশঙ্কা না থাকলেও শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে বহুমাত্রিক নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়।

বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও আশপাশের পার্ক, সড়কজুড়ে বাড়ানো হয় সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি।

এছাড়া সরকারি নির্দেশনায় ফানুস ওড়ানো, আতশবাজি, গ্যাস বেলুন এবং ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশব্যাপী সব অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত কয়েক বছরের চিত্রে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের আয়োজিত শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বেশি ছিল। শোভাযাত্রার অগ্রভাগে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়, যেখানে সদস্যদের হাতে থাকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। এর পাশাপাশি চারপাশে অবস্থান নেয় বিভিন্ন ইউনিট, সাদা পোশাকের গোয়েন্দা, সোয়াত ও মোটরসাইকেল টিম। ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথ থেকেও সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।

এ বছরও পয়লা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা ঘিরে বড় প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও মাঠের প্রস্তুতি নিয়েছে জোরেশোরে। কোনো ধরনের জঙ্গি আক্রমণ বা অন্যান্য কোনো নাশকতা নেই বলে জানানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে। তবুও সংশ্লিষ্টজনরা বলছেন, নাগরিকদের পূর্ণ মাত্রার নিরাপত্তা দিতে তাদের যে কার্যক্রম, সেটি পুরোপুরি ঢেলে সাজানো হয়েছে। 

যেসব নিষেধাজ্ঞা থাকছে

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফানুস ওড়ানো, আতশবাজি ফোটানো, গ্যাস বেলুন উড়ানো এবং ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৩০০ ফিট এলাকায় মোটরসাইকেল বা গাড়ির রেসিং বন্ধে কঠোর নজরদারি ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ১৪ এপ্রিল নিরাপত্তাজনিত কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধ থাকবে। এর আগে, ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারবিহীন কোনো যানবাহন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবে না বলেও জানানো হয়েছে।

শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে হবে যেভাবে

পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা মুখোশ পরে মিছিলে যোগ দিতে পারবেন না, তবে হাতে বহন করা যাবে। প্রদর্শনীর মুখোশ এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে কারও মুখ আড়াল না হয়।

শোভাযাত্রায় অংশ নিতে হলে শুরু থেকেই উপস্থিত থাকতে হবে; মিছিল শুরু হওয়ার পর মাঝপথে প্রবেশের সুযোগ থাকবে না। নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ মানুষকে ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, দিয়াশলাই বা লাইটার বহন না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কোনো ধরনের বিজ্ঞাপনী স্টিকার বা প্রচারণামূলক উপকরণ নিয়ে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

অংশগ্রহণকারীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের স্বেচ্ছাসেবক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রোভার স্কাউট সদস্যদের নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে। কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি বা বস্তু নজরে এলে দ্রুত নিকটস্থ পুলিশকে জানাতে হবে। এছাড়া রবীন্দ্র সরোবর, রমনা পার্ক এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ সব উন্মুক্ত স্থানে আয়োজিত অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফ নূর মনে করেন, সাধারণ মানুষের মনে ভীতি তৈরি করে কখনোই স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব সম্ভব নয়। তার ভাষায়, উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে তখনই, যখন মানুষ নির্ভয়ে, নিরাপদ পরিবেশে অংশ নেয়, আনন্দ করে, হাসে, এবং মন খুলে কথা বলে। 

তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্র অতীতের মতো এখনও মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয়ের আবহ তৈরি করে রাখছে। তার মতে, শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানুষ; এমনকি পাঞ্জাবি-টুপি পরিহিত অংশগ্রহণকারীরাও থাকেন, যা এ উৎসবের বহুমাত্রিকতাকে তুলে ধরে। তাই নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত সশস্ত্র উপস্থিতি বা মহড়া আয়োজন না করে জনগণকে আরও মুক্ত ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বাংলা নববর্ষ বাঙালি জাতির একটি গভীর ঐতিহ্যবাহী উৎসব। যদিও কিছু গোষ্ঠী নীতিগতভাবে এ আয়োজনকে সমর্থন করে না, তবুও এটি বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বহমান রয়েছে।

হুমকি ও নিরাপত্তা সম্পর্কে যা জানালেন পুলিশের কর্মকর্তারা

বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, এবারের পয়লা বৈশাখ উদযাপন ঘিরে নির্দিষ্ট কোনো হুমকি নেই। তবুও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে নেওয়া হয়েছে বহুস্তরীয় ব্যবস্থা। শোভাযাত্রা ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নজরদারি, মোতায়েন থাকবে অতিরিক্ত সদস্য, সাদা পোশাকের গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. সরওয়ার তার বাহিনীকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কর্তব্য পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনগণের যে আস্থা গড়ে উঠেছে, তা সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে রক্ষা করা জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে সতর্ক ও দায়িত্বনিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে।

ডিএমপি উপকমিশনার (জনসংযোগ) এনএম নাসিরুদ্দিন বলেছেন, পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে এ মুহূর্তে কোনো ধরনের হুমকি বা ঝুঁকির নির্দিষ্ট আশঙ্কা নেই। তবে উৎসবকে নির্বিঘ্ন রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকবে। 

তিনি জানান, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

এ দিনের নিরাপত্তার বিষয়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, সন্ত্রাসী তৎপরতা কখন, কোথায় এবং কীভাবে ঘটতে পারে তা আগাম নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এ ধরনের হামলা অনেক সময় আকস্মিকভাবেই সংঘটিত হয়। তাই যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবসময় প্রস্তুত থাকা এবং অপচেষ্টা প্রতিহত করাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব।

তিনি জানান, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বড় আয়োজন বা শোভাযাত্রাকে ঘিরে বিচ্ছিন্নভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা হয়েছে। এ কারণে এমন আয়োজনগুলোকে কেন্দ্র করে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়। সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় র‍্যাব, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে কাজ করে।

ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, নির্ধারিত রুট ম্যাপ অনুযায়ী শোভাযাত্রা পরিচালিত হয় এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ চেকপয়েন্টে জোরদার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। মাঠে দায়িত্ব পালন করে মোটরসাইকেল টিম, মোবাইল টহল ও স্ট্যাটিক ফোর্সের বিভিন্ন ইউনিট। পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সাদা পোশাকে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালান। পুরো নিরাপত্তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য স্থাপন করা হয় একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল পয়েন্ট, এবং আগের দিন থেকেই ডিএমপি ও র‍্যাবের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রস্তুতি শুরু হয়। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ওয়াচ টাওয়ার বসিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।

তিনি আরও জানান, আকাশপথ থেকে নজরদারির জন্য ড্রোন ব্যবহার করা হয়, যা কেবল অনুমোদিত বাহিনী পরিচালনা করে। একই সঙ্গে সাইবার জগতেও নজরদারি জোরদার রাখা হয়, যাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, প্রোপাগান্ডা বা উসকানিমূলক তথ্য ছড়িয়ে কোনো অস্থিতিশীলতা তৈরি না হয়। তার ভাষায়, ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সম্ভাব্য হুমকি আগেভাগেই চিহ্নিত করে প্রতিরোধ করাই তাদের মূল লক্ষ্য, এবং সর্বোচ্চ সতর্কতার মধ্য দিয়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪