স্টাফ রিপোর্টার: ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যঘেরা হত্যাকাণ্ড। মাত্র ৯ মিনিটের সামরিক অভিযানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান।
বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, গবেষণা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে উঠে এসেছে, ২৯ ও ৩০ মে মধ্যরাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে তিনটি সামরিক যানবাহনে ১৬ জন সেনা কর্মকর্তা সার্কিট হাউসের উদ্দেশে রওনা হন। তখন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। সার্কিট হাউসে অবস্থান করছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে তিনি আগের দিন চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোররাতের ওই অভিযানে একদল সেনা কর্মকর্তা সার্কিট হাউসের দ্বিতীয় তলায় উঠে যায়। গোলাগুলির শব্দ শুনে দরজা খুলে বাইরে দেখার চেষ্টা করলে জিয়াউর রহমানকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। মেশিনগানের ব্রাশফায়ারে তার মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়।
ঘটনার কিছুক্ষণ পর চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ফোন করে মেজর মোজাফফর হোসেন জানান, “দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড।”
সেই ঘটনায় আরও নিহত হন প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের সদস্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল আহসান ও ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খান।
ঘটনার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা রাষ্ট্রপতির মরদেহ সার্কিট হাউস থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। পরে রাঙ্গুনিয়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় জিয়াউর রহমানসহ তিন সেনা কর্মকর্তার মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার (অব.) হান্নান শাহ ও পুলিশের তৎকালীন কর্মকর্তা গোলাম কুদ্দুসের নেতৃত্বে সেই কবর শনাক্ত করে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে কফিনে করে মরদেহ ঢাকায় পাঠানো হয়।
গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে জিয়াউর রহমানের মুখ, কাঁধ, হাত ও পায়ে গুলির চিহ্নের কথা উল্লেখ ছিল। মাথার খুলির একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মস্তিষ্ক বেরিয়ে এসেছিল বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।
তবে পুরো প্রক্রিয়াটি গোপনীয় ও সীমিত পরিসরে সম্পন্ন হওয়ায় জিয়াউর রহমানের মরদেহ শনাক্তকরণ ও দাফন নিয়ে পরবর্তীতে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কফিন ঢাকায় পৌঁছানোর পরও সেটির ঢাকনা খোলা হয়নি। ফলে কফিনে থাকা মরদেহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা রয়ে গেছে।
গবেষক, লেখক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের অনেকে মনে করেন, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর শুরু হওয়া সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতার শেষ বড় অধ্যায়। আবার অনেকের মতে, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তানফেরত কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্বও এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই মেজর জেনারেল আবুল মনজুরকে আটক ও পরে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে বিচারের নামে বহু সেনা কর্মকর্তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়, যা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড এখনো একটি অসম্পূর্ণ ও রহস্যাবৃত অধ্যায়। ঘটনার চার দশক পেরিয়ে গেলেও এর অনেক প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি