রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: ঋতুচক্রের অনিবার্য আবর্তনে জীর্ণ-পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে মহাকালের গর্ভে বিলীন হতে চলেছে আরেকটি বাংলা বছর। চৈত্রের প্রখর দুপুর আর শুকনো পাতার মৃদু শব্দ যেন বয়ে আনে বিদায়ের এক বিষণ্ন সুর যার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে নতুনের আহ্বান, নবজাগরণের প্রতিশ্রুতি। সেই আবহেই আজ পালিত হচ্ছে বাংলা বছরের শেষ দিন চৈত্র সংক্রান্তি।
আজ ৩০ চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। পঞ্জিকার হিসাবে এটি বছরের শেষ দিন হলেও এর তাৎপর্য বহুমাত্রিক। এটি শুধু একটি বছরের সমাপ্তি নয় বরং পুরনো ক্লান্তি, গ্লানি ও ব্যর্থতাকে বিদায় জানিয়ে নতুন উদ্যমে জীবন শুরুর প্রতীকী সময়। তাই চৈত্র সংক্রান্তি বিদায় ও সূচনার এক অনন্য সন্ধিক্ষণ।
বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে এই দিনটি। অঞ্চলভেদে আচার-অনুষ্ঠানে ভিন্নতা থাকলেও এর মূল সুর এক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। একসময় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে এটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের অংশগ্রহণে চৈত্র সংক্রান্তি পেয়েছে সার্বজনীন রূপ।
গ্রাম বাংলায় এই দিনের আবহ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। পুরনো বছরের সব দুঃখ-গ্লানি ঝেড়ে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করার প্রস্তুতিতে মুখর থাকে জনপদ। ব্যবসায়ীদের মধ্যে পুরনো হিসাব চুকিয়ে নতুন করে ‘হালখাতা’ খোলার প্রথা নতুন সূচনার প্রতীক হিসেবে এখনো প্রচলিত।
খাদ্য সংস্কৃতিতেও রয়েছে বিশেষত্ব। এদিন অনেকেই আমিষ বর্জন করে নিরামিষ খাবার গ্রহণ করেন। কোথাও কোথাও ১৪ প্রকার শাক দিয়ে ‘শাকান্ন’ রান্নার রীতি পালন করা হয়। আবার কিছু অঞ্চলে ছাতু খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। চৈত্র মাসে রোগবালাই থেকে রক্ষা পেতে তেতো ও শাকসবজি খাওয়ার যে প্রাচীন রীতি, তা স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতির এক যুগল প্রতিফলন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য দিনটি বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে। ব্রতপালন, শিবপূজা এবং বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তারা দিনটি পালন করেন। মন্দির কিংবা গৃহে পূজার পাশাপাশি প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে আগামী দিনের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করা হয়।
সময়ের পরিবর্তনে শহুরে জীবনে চৈত্র সংক্রান্তির রূপ কিছুটা বদলালেও গ্রামীণ ঐতিহ্যের আবেদন আজও অম্লান। মেলা, পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ, পটচিত্র, যাত্রাপালা, লোকসংগীত ও নৃত্যের আয়োজন দিনটিকে করে তোলে উৎসবমুখর। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
এ বছরও দিনটিকে ঘিরে দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে বর্ণিল অনুষ্ঠানমালা। এর অংশ হিসেবে বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হবে লোকশিল্প প্রদর্শনী। প্রায় ৫০ জন যন্ত্রশিল্পীর অংশগ্রহণে পরিবেশিত হবে অর্কেস্ট্রা ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’। এছাড়া উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ৩০ জন নৃত্যশিল্পীর পরিবেশনায় ধামাইল নৃত্য দর্শকদের মুগ্ধ করবে।
অনুষ্ঠানে আরও থাকছে জারিগান, পটগান ও পুঁথিপাঠের পরিবেশনা। পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংগীত ও নৃত্য আয়োজন উৎসবে যোগ করবে বৈচিত্র্যের মাত্রা। লোকজ ধারার অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে মঞ্চস্থ হবে যাত্রাপালা ‘রহিম বাদশা রূপবান কন্যা’, যা দর্শকদের ফিরিয়ে নেবে গ্রামীণ জীবনের চিরায়ত আবহে।
সূত্র: বাসস
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম