তাওহীদাহ্ রহমান নূভ:
দিনকাল এমনিতেই ভালো যাচ্ছিল না। চাল কিনতে গেলে ডাল কাঁদে, আর ডাল ছুঁলে তেলের বাজারে আগুন লাগে। মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তের সংসারগুলো যখন কাটছাঁট করতে করতে একেবারে হাড় জিরজিরে জ্যামিতিক ফ্রেমে এসে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই মাথার ওপর ভেঙে পড়ল আস্ত এক ‘কারেন্ট শক’। এক লাফে বিদ্যুতের দাম বাড়ল ২০ শতাংশ! ঘোষণাটা যেন ঠিক বৈশাখী ঝড় নয়, একেবারে ভরদুপুরে বিনা মেঘে বজ্রপাত।
বলা হচ্ছে, ভর্তুকির বোঝা কমাতেই নাকি এই দাওয়াই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সামষ্টিক অর্থনীতির বড় বড় টেবিলের হিসাব মেলাতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের কোটি মানুষের জীবনের হিসাবটা কেন বারবার ওলটপালট হয়ে যায়? এই ২০ শতাংশের ধাক্কা কেবল কাগজের কলমে একটা সংখ্যা হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ, অর্থনীতি আর রাজনীতির ক্যানভাসে এটা এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।
মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুম: এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
অর্থনীতিবিদরা একে হয়তো বলবেন ‘ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস’, আর সাধারণ মানুষ বুঝবেন ‘পকেট ফাঁকা’। ২০ শতাংশ দাম বাড়ার সোজা সাপটা মানে হলো—মাস শেষে যে মধ্যবিত্তের বিল আসত ৩ হাজার টাকা, এখন তা অনায়াসে ৩৬০০ টাকা ছোঁবে। যে সংসারে শ’খানেক টাকা বাঁচানোর জন্য গৃহিণীকে হিসাবের খাতা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যুদ্ধ করতে হয়, সেখানে এই বাড়তি কয়েকশো টাকা এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক চাপ।
এখন ঘরে ঘরে শুরু হবে এক অদৃশ্য যুদ্ধ। "লাইটটা নেভাও", "ফ্যানটা বন্ধ করো", "এসি চালানো একদম নিষেধ"—এই সংলাপগুলো এখন আর শুধু গৃহকর্তার তর্জনী উঁচানো বকুনি থাকবে না, এটা হয়ে উঠবে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সারাদিন খাটাখাটনি শেষে ঘরে ফিরে একটু শান্তিতে ঘুমানো বা বিনোদনের যেটুকু সুযোগ ছিল, সেখানেও এখন বিদ্যুতের মিটার একটা ভূত হয়ে ঘাড়ে চেপে বসবে। মানুষের একটু স্বস্তির ওপরও এই দাম বৃদ্ধি এক ধরনের অদৃশ্য কর বসিয়ে দিল।
আর্থ-সামাজিক ‘ডমিনো ইফেক্ট’: বাজারের আগুনে নতুন ঘি
বিদ্যুতের দাম বাড়া মানে কিন্তু শুধু লাইট-ফ্যানের বিল বাড়া নয়। এটা হলো অর্থনীতির সেই ‘ডমিনো ইফেক্ট’—যেখানে একটা ঘুঁটি পড়লে লাইনের বাকি সব ঘুঁটি টপাটপ পড়তে থাকে। বিদ্যুতের দাম বাড়ার সাথে সাথে শিল্প উৎপাদন ও কৃষিতে সেচের খরচ বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে পণ্য ও খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন ব্যয়ে। আর শেষমেশ বাজারে সবকিছুর চড়া মূল্য আমজনতার নাভিশ্বাস তুলে ছাড়বে।
চালের মিল থেকে শুরু করে দেশের লাইফলাইন তৈরি পোশাক কারখানা—সবখানেই শক্তির প্রধান উৎস বিদ্যুৎ। যখন উৎপাদন খরচ এক ধাক্কায় বেড়ে যাবে, মিল মালিক বা ব্যবসায়ী কি নিজের পকেট থেকে সেই ক্ষতিপূরণ দেবেন? একেবারেই না। তারা সেটা পরম যত্নে উশুল করবেন ভোক্তার পকেট থেকে। ফলে বাজারে আলু, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম আরও এক দফা লাফিয়ে বাড়বে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের মেরুদণ্ড হলো কৃষি। বোরো চাষ বা অন্যান্য ফসলের জন্য মাঠপর্যায়ে যে সেচ দিতে হয়, তার একটা বড় অংশ বিদ্যুৎচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। সেচের খরচ বাড়া মানে চালের উৎপাদন খরচ বাড়া। অর্থাৎ, থালায় ভাত বাড়ার আগেই ভাতের দাম বেড়ে যাওয়া নিশ্চিত।
সামষ্টিক অর্থনীতি ও সুশাসনের প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ঋণের শর্ত জুড়ে দেওয়া বা জ্বালানি খাতের লোকসান বন্ধ করার যুক্তি সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হতেই পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হলো—সুশাসনের অভাব আর ভুল নীতির মাশুল কেন সবসময় প্রান্তিক মানুষকে দিতে হবে?
সিস্টেম লস (পড়ুন: চুরি) এবং কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোকে বসিয়ে রেখে যে হাজার হাজার কোটি টাকার ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা জরিমানা গোনা হচ্ছে, সেই অপচয় আর দুর্নীতির লুপহোলগুলো বন্ধ করার কার্যকর উদ্যোগ কোথায়? ভেতরের গলদ দূর না করে সরাসরি জনগণের পকেটে হাত দেওয়াটা সাময়িক সমাধান দিতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে আরও ভঙ্গুর করে তোলে। বিশেষ করে বৈশ্বিক মন্দার এই সময়ে আমাদের রপ্তানি খাত যখন প্রতিযোগিতার মুখে, তখন বিদ্যুতের এই চড়া দাম উৎপাদনকারীদের আন্তর্জাতিক বাজারে আরও পিছিয়ে দেবে।
রাজনীতির ভোল্টেজ: অদূর ভবিষ্যতে সরকারের জন্য কেমন হবে এই চাল?
রাজনীতিতে একটা আপ্তবাক্য আছে—জনগণ অনেক কিছু সহ্য করতে পারে, কিন্তু পেটে লাথি আর পকেটে টান পড়লে চেনা সমীকরণও উল্টে যায়। অদূর ভবিষ্যতে এই ২০ শতাংশ দাম বৃদ্ধির রাজনৈতিক প্রভাব নীতিনির্ধারকদের জন্য বেশ অস্বস্তিকর হতে পারে।
প্রথমত, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে চরমে নিয়ে যাবে। এই গণ-অসন্তুষ্টির পারদকে পুঁজি করে যেকোনো সময় রাজপথে জনমত তৈরি হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। দ্বিতীয়ত, এর ফলে এক গভীর আস্থার সংকট তৈরি হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বার্তা যাবে যে, রাষ্ট্র হয়তো মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার চেয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির সংখ্যা মেলাতেই বেশি ব্যস্ত।
শেষ কথা: অন্ধকারের আলো নাকি আলোর অন্ধকার?
দিনের শেষে বিদ্যুৎ মানে কেবল আলো বা ফ্যানের হাওয়া নয়; বিদ্যুৎ হলো আধুনিক জীবনযাত্রার রক্তসঞ্চালনের মতো। সরকার হয়তো সাময়িকভাবে কাগজের কলমে ঘাটতি কমাল বা দাতা সংস্থাগুলোর খাতায় ‘গুড বয়’ নম্বর পেল, কিন্তু ভেতরের যে ক্ষোভের সলতেটায় আগুন পড়ল, তা নেভানো সহজ নয়।
বিদ্যুৎ চমকালে যেমন আকাশ আলো হয়, দামের এই আকস্মিক বিদ্যুৎ চমকানি কিন্তু জনজীবনে এক দীর্ঘস্থায়ী ছায়া ফেলার উপক্রম করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই ২০ শতাংশের ধাক্কা সামলে দেশের অর্থনীতি কতটা ‘লোডশেডিং’ মুক্ত হতে পারে, নাকি সাধারণ মানুষের ধৈর্যের ফিউজটাই শেষ পর্যন্ত উড়ে যায়!
লেখক: কবি ও সম্পাদক (কবিয়াল)