ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: বুধবার ভোরে ইরানের একাধিক সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর আকস্মিক ও বিধ্বংসী হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কুয়েত, বাহরাইন এবং জর্ডানের মতো মার্কিন ঘাঁটি পরিচালনাকারী দেশগুলো লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়েছে তেহরান।
গত দুই মাস ধরে চলা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভাঙার এটি চলতি সপ্তাহের দ্বিতীয় ঘটনা। বৈরি দুই দেশের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানের চলমান সমস্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন ভেস্তে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়েছে। এই চরম উত্তেজনার মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তেহরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শান্তি আলোচনা দীর্ঘায়িত করার জন্য ইরানকে এখন ‘চরম মূল্য দিতে হবে’।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মাধ্যমে ইরানের সাথে এই সর্বাত্মক যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। গত কয়েক মাসের এই যুদ্ধ ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে নাড়া দিয়েছে; বিশ্ববাজারে হু হু করে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম, যার ফলে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর দামও আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে। বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯২ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২৫ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি।
বুধবারের এই হামলায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড- সেন্টকম জানিয়েছে, তাদের যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এবং নজরদারি রাডার সাইটগুলোকে নিখুঁতভাবে নিশানা করেছে। ইরানও বন্দর আব্বাস এবং কেশম দ্বীপের আশেপাশে এই মার্কিন হামলার কথা স্বীকার করেছে, তবে ক্ষয়ক্ষতির কোনো বিবরণ দেয়নি।
আমেরিকার এই আগ্রাসনের পরপরই ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক কড়া জবাবের হুঁশিয়ারি দেন এবং এর কিছুক্ষণের মধ্যেই জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান। জর্ডানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘পেত্রা’ জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অন্তত ৫টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝআকাশেই ধ্বংস করেছে, যা মূলত মার্কিন এফ-৩৫ ফাইটার জেট ও অন্যান্য যুদ্ধবিমান পরিচালনাকারী ‘মুয়াফফাক সালতি’ বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয়েছিল। অন্যদিকে বাহরাইন এবং কুয়েতও তাদের ভূখণ্ডে ধেয়ে আসা ইরানি মিসাইল প্রতিহত করার কথা নিশ্চিত করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই মার্কিন হামলাকে ইরানের সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং তুর্কি ও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে ফোনালাপে ইরানের ‘স্বার্থরক্ষায় আত্মরক্ষার সহজাত অধিকার’ পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বুধবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই নতুন মার্কিন হামলার পর ইরান যুদ্ধ থামানোর শান্তি আলোচনার টেবিলে থাকবে কি না, তা নতুন করে বিবেচনা করবে। তবে, এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই কাতারের একটি উচ্চপর্যায়ের মধ্যস্থতাকারী প্রতিনিধি দল বুধবার তেহরানে পৌঁছেছে।
এই ভয়াবহ পাল্টাপাল্টি হামলার ঠিক একদিন আগে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে ইরানের একটি ড্রোনের সাথে সংঘর্ষের পর মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি অ্যাটাক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। ড্রোনের সাহায্যে চালকবিহীন একটি বিশেষ বোটের মাধ্যমে হেলিকপ্টারের দুই ক্রু সদস্যকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এই সংঘর্ষটি ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, তা এখনও তদন্তাধীন।
এই ঘটনার পরেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্থিতিশীল নীতি আবারও প্রকাশ পায়। সোমবার যেখানে তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন যে আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের সাথে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন হবে, সেখানে বুধবার হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার পর তিনি ইরানের ওপর তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন।
আগামী নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচনের আগে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্প একটি দ্রুত যুদ্ধবিরতি বা ‘কুইক উইন’ খুঁজছেন, তবে তিনি ইরানের সামনে এমন কিছু শর্ত রাখছেন যা তেহরানের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব।
আমেরিকা চায় ইরান তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সমস্ত মজুদ পুরোপুরি ধ্বংস করুক। কিন্তু ইরান ইউরেনিয়াম ছাড়তে নারাজ এবং তারা যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তির আগেই মার্কিন ব্যাংকে ফ্রিজড বা জব্দ হয়ে থাকা তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করার এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। ট্রাম্প ইরানের এই আগাম শর্ত প্রত্যাখ্যান করে লিখেছেন, ইরান একটি দারুণ চুক্তিতে পৌঁছাতে বড্ড বেশি সময় নষ্ট করে ফেলেছে, এখন তাদের মূল্য দিতেই হবে!
আমেরিকা ও ইরান কোনোভাবে একটা সমঝোতার পথ খুঁজলেও, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনেক বেশি কঠিন লক্ষ্য পূরণে অনড়। নেতানিয়াহু মূলত ইরানের থিওক্রেটিক বা ইসলামি সরকারের পতন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির সম্পূর্ণ বিলুপ্তি এবং লেবাননে ইরানের প্রধান মিত্র হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে মরিয়া।
নেতানিয়াহুর এই কট্টর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো ধরণের আপোষ বা শান্তি চুক্তিকে অসম্ভব করে তুলছে। বুধবারও নেতানিয়াহু হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, "ইরান ও তার প্রক্সি বা সহযোগী দলগুলো যারা পুরো বিশ্বের জন্য হুমকি, তাদের বিরুদ্ধে ইসরাইল আরও শক্তিশালী শক্তি প্রয়োগ অব্যাহত রাখবে।"
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী গত ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর আস্তানা লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, টায়ার শহরের পূর্বাঞ্চলে একটি গ্রামে ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ছয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় সিডন শহরে একটি গাড়িতে ইসরাইলি ড্রোনের নিখুঁত আঘাতে আরও দুজন নিহত হয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সামরিক আগুন এখন ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্য রুটগুলোতেও। ইয়েমেনের উপকূলবর্তী এডেন উপসাগরে একটি ছোট নৌকায় চড়ে আসা বন্দুকধারীরা একটি বিশাল বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালালে, জাহাজে থাকা সশস্ত্র রক্ষীদের সাথে তাদের তুমুল গোলাগুলি হয়। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ‘ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’ জানিয়েছে, রক্ষীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে বন্দুকধারীরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
এর কিছুক্ষণ পরেই, হরমুজ প্রণালীর কাছে ওমান উপসাগরে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ইঞ্জিন রুমে রহস্যময় ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর দেয় ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস। এই ঘটনায় ট্যাঙ্কারের একজন কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন এবং দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে ঠিক কী কারণে বা কার হামলায় এই আগুন লেগেছে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জ্বালানি ও বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ ইরান যেভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে, সেটাই এখন তেহরানের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ট্রাম্প কার্ড। আর এই কারণেই আমেরিকার একের পর এক বিধ্বংসী বোমা হামলার পরেও ইরান এখনও বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব