স্টাফ রিপোর্টার: সরকারি পর্যায়ে সেবা খাতে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে পাসপোর্ট অফিস। টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাসপোর্ট সেবায় ঘুষের শিকার হওয়া খানার হার জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
ভৌগোলিক অবস্থানভেদে এই হার গ্রামাঞ্চলে ৭৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ। পাসপোর্ট অফিসের পর অন্যান্য প্রধান সেবা খাতগুলোর ঘুষের হার যথাক্রমে—বিআরটিএ ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ, কৃষি ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ভূমি সেবা ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সার্বিকভাবে দেশের ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি খাতে ঘুষের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে পাসপোর্ট খাতের চিত্রটি সবচেয়ে উদ্বেগজনক।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ এর তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন উপস্থাপন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালেও পাসপোর্ট (৭৬.৬ শতাংশ) এবং বিআরটিএ (৬৩.৫ শতাংশ) সেবা নিতে গিয়ে মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হয়েছেন। এর পরেই রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি এবং বিচারসংশ্লিষ্ট খাত। এসব খাতে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণও সবচেয়ে বেশি।
তবে একটি ইতিবাচক দিক হলো, সার্বিকভাবে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। গত বছরে খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫,১২৪ টাকা।
জনগণের ধারণা ও প্রতিকার ব্যবস্থার নিষ্ক্রিয়তা
জরিপে অংশ নেওয়া ৮১.৫ শতাংশ পরিবার মনে করে, ঘুষ ছাড়া সাধারণ সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা ও বিচারিক খাতের দুর্নীতি মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে রুদ্ধ করছে। এছাড়া কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকারের মতো মৌলিক খাতগুলোতেও দুর্নীতির হার অপরিবর্তিত বা ঊর্ধ্বমুখী।
দুর্নীতির শিকার হওয়ার পরও ৬১.৩ শতাংশ পরিবার কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেনি। এর প্রধান কারণগুলো হলো ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা। বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন পুরো ব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অজ্ঞতা। প্রায় অর্ধেক পরিবার জানেই না কোথায় এবং কীভাবে অভিযোগ করতে হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্পর্কে মাত্র ২৯.৫ শতাংশ এবং সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে মাত্র ১.৪ শতাংশ পরিবার অবগত। এমনকি অভিযোগ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা গ্রহণ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নারী, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী’ ব্যক্তিদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও বেশি দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ভৌগোলিক দিক থেকে গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলো শহরের তুলনায় বেশি ঘুষের শিকার হয় (৬৬ শতাংশ বনাম ৫৮.৫ শতাংশ)। তবে টাকার অঙ্কে শহরের মানুষ বেশি অর্থ দিতে বাধ্য হন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের তুলনায় অনেক বেশি হারে ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মতে, এই ব্যাপক দুর্নীতির পেছনে মূল কারণগুলো হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সচেতনতার অভাব এবং দুর্নীতিবাজদের শাস্তির বদলে পুরস্কৃত বা সুবিধা পাওয়ার প্রবণতা।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব