আনিসুর রহমান, নেত্রকোণা প্রতিনিধি: দীর্ঘ এক মাস পর দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্যভাণ্ডার নেত্রকোণাসহ হাওরাঞ্চলে আবার শুরু হয়েছে মাছ ধরা। গত ২৮ জুন শেষ হয়েছে সরকারের জারি করা মাসব্যাপী নিষেধাজ্ঞা। সোমবার (২৯ জুন) সকাল থেকেই জেলেরা জাল ও নৌকা নিয়ে হাওরে মাছ ধরতে নেমে পড়েছেন। তবে এক মাসের এই নিষেধাজ্ঞা শেষে হাওরপাড়ের প্রান্তিক জেলেদের মধ্যে আনন্দের চেয়ে ক্ষোভ ও হতাশাই বেশি দেখা গেছে।
জেলেদের অভিযোগ, দিনের বেলা প্রশাসনের কিছুটা কড়াকড়ি ও অভিযান থাকলেও রাতের আঁধারে প্রভাবশালীরা অবাধে মাছ আহরণ করেছে। ফলে মা মাছ ও পোনা রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া সরকারি উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। উল্টো সাধারণ ও প্রান্তিক জেলেরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
হাওরপাড়ের জেলেদের ভাষ্য, দিনের বেলায় প্রশাসনের অভিযান চললেও রাতে তদারকির অভাব ছিল। এ সুযোগে গত এক মাস ধরে প্রভাবশালী চক্র হাওরের বিভিন্ন অংশ থেকে অবাধে মাছ শিকার করেছে। স্থানীয়দের দাবি, এ কারণে নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়েছে। পেটের দায়ে কিছু সাধারণ জেলে গোপনে মাছ ধরতে বাধ্য হলেও বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা নিয়েছে প্রভাবশালী মহল।
এ বছর পাহাড়ি ঢল ও অকাল বন্যায় হাওরাঞ্চলের প্রধান ফসল বোরো ধান ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষক ও জেলে পরিবারের শেষ ভরসা ছিল হাওরের দেশীয় মাছ। কিন্তু ‘প্রোটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ অ্যাক্ট, ১৯৫০’ অনুযায়ী গত ২৯ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত প্রথমবারের মতো হাওরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হলে তারা চরম সংকটে পড়েন।
নিষেধাজ্ঞার পুরো সময় সরকারি নির্দেশনা মেনে জেলেরা কর্মবিরতিতে থাকলেও হাওর অধ্যুষিত সাত জেলার ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলো কোনো সরকারি বা বেসরকারি খাদ্য কিংবা আর্থিক সহায়তা পায়নি। জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোণায় নিবন্ধিত জেলে পরিবারের সংখ্যা ৪৯ হাজার ৩৯৩টি। বিকল্প কর্মসংস্থান বা প্রণোদনার অভাবে বহু পরিবারকে ধার-দেনা করে চলতে হয়েছে। অনেক পরিবারে সন্তানদের লেখাপড়াও ব্যাহত হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ জানান, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেটসহ মোট সাতটি হাওর অধ্যুষিত জেলায় মাছের প্রজনন নিশ্চিত করতে এবং ছোট মাছ বড় হওয়ার সুযোগ দিতে ৩১ দিনের এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। প্রথমবারের মতো সরকারি গেজেটের মাধ্যমে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “২৫ জুন পর্যন্ত প্রায় ৫৫টি অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এতে প্রায় ৭০০টি চায়না দুয়ারী জাল ও ২৩৭টি কারেন্ট জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া একটি জালের গুদাম জব্দ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫৯ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।”
জেলেদের প্রণোদনার বিষয়ে তিনি বলেন, “প্রথমবার হওয়ায় এবার কোনো প্রণোদনা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে জেলেদের তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছে। আগামী বছর তাদের ভিজিএফ বা ভিজিডির আওতায় এনে খাদ্য বা অর্থ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাবনা রয়েছে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ নিষেধাজ্ঞার ফলে ভবিষ্যতে দেশীয় মাছের উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বার্সিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ওয়াহেদুর রহমান বলেন, বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা ও খাদ্য সহায়তা ছাড়া শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মাছের প্রজনন রক্ষা করা সম্ভব নয়।
হাওরবাসীর প্রশ্ন, দেশীয় মাছের বংশবৃদ্ধি রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি আইন মেনে কর্মহীন হয়ে পড়া হাজারো প্রান্তিক জেলের জীবিকার দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী বছর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে পর্যাপ্ত প্রণোদনা এবং রাতের বেলায় অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন