| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ঋণনির্ভর নয়, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: অর্থমন্ত্রী

reporter
  • আপডেট টাইম: জুন ২৯, ২০২৬ ইং | ১৯:৪৬:১৯:অপরাহ্ন  |  ৩১৭ বার পঠিত
ঋণনির্ভর নয়, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: অর্থমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার: দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও লুণ্ঠিত আর্থিক খাত সংস্কার করে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি ঘোষণা করেছেন, বাংলাদেশ এখন ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে যাত্রা শুরু করেছে।

একইসঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।

সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এই বাজেট কেবল সরকারের বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি নয়; এটি জনজীবনে স্বস্তি আনা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কাঠামোগত সংস্কার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের রূপরেখা।’

তিনি উল্লেখ করেন, উত্তরাধিকার হিসেবে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি পেলেও বর্তমান সরকারের ৩আর (রিকভারি, রেস্টোরেশন, রিকন্সট্রাকশন) কৌশলের মাধ্যমে দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ৭.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি এবং ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অনেকের সংশয়ের জবাব দেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে আমরা কেবল অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছি। মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ৬০টি পণ্যের উৎসে কর হ্রাস এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করার মাধ্যমে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে।’

প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘জিডিপি প্রবৃদ্ধি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি আস্থার প্রতিফলন। আইসিটি, কৃষি ও ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে অর্থনীতির মূলধারায় এনে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।’

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে আমির খসরু বলেন, ‘আমরা করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং করের ভিত্তি বাড়িয়ে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চাই। প্রথমবারের মতো এনবিআর ৪ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধে আমরা ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের সুযোগ দিচ্ছি, তবে কাঁচাবাজার ও মুদি দোকান এর আওতার বাইরে থাকবে।’

তিনি আরও জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগে ছিল ২৭.২৭ শতাংশ। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় ৭২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বিগত সরকারের সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সরকার অপ্রয়োজনে ঋণ নিয়ে দেশের ঋণধারণ সক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বর্তমানে মোট ঋণের পরিমাণ ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা জিডিপি’র ৩৮.৬১ শতাংশ। এই ঋণের সুদ আমাদের সময়মতো পরিশোধ করতে হচ্ছে।’

এই সংকট কাটাতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমিয়ে দিচ্ছি। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিকল্প অর্থায়ন হিসেবে হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে বিশেষ বিনিয়োগ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

পাচার করা অর্থ ফেরানোর বিষয়ে আমির খসরু দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘জনগণের টাকা যারা আত্মসাৎ করেছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। ১৩টি দেশে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্টেন্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে এবং মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে।’

পাঁচটি শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের আমানত রক্ষাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাদের হিসাব থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক উত্তোলন করতে পারবেন। জটিল রোগে আক্রান্ত ও হজ যাত্রীদের জন্য বিশেষ ছাড় থাকবে।’ এছাড়া ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের লক্ষ্যে ‘ব্যাংক রেজলিউশন আইন, ২০২৬’-এর বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাটি বিলোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নে একগুচ্ছ প্রস্তাব

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে অর্থমন্ত্রী অর্থ বিলে বড় ধরনের কর ছাড়ের প্রস্তাব আনেন। তার উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলো হলো–

►জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত রাখা।

►শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হলেই ২.৫% কর হ্রাস।

►আইপিও বা আরপিও-র মাধ্যমে ১০% শেয়ার অফলোড করলে আরও ২.৫% কর ছাড়।

►ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনকারী তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য বিশেষ কর সুবিধা।

►ব্যক্তি করদাতাদের লভ্যাংশের ওপর কর কমিয়ে ১৫% করা।

►মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ৫ লাখ টাকার সীমা প্রত্যাহার।

আইএমএফ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

আইএমএফ থেকে ‘শূন্য হাতে’ ফেরার সমালোচনা নাকচ করে আমির খসরু বলেন, ‘আমরা শূন্য হাতে ফিরিনি। আগের সরকারের সময় নেওয়া কিছু শর্ত দেশ ও জনগণের পরিপন্থি হওয়ায় আমরা সেই প্রোগ্রাম থেকে বেরিয়ে এসেছি। এখন নতুন করে দেশের স্বার্থ রক্ষা করে আইএমএফের সঙ্গে প্রোগ্রাম নেওয়া হবে।’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন ও মালয়েশিয়া সফর দেশের অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বড় অবদান রাখবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান

জ্বালানি খাতের চরম দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এলএনজি টার্মিনাল বৃদ্ধি, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি। এতে শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে।’

বিনিয়োগের চারটি মূল ভিত্তি

আমির খসরু জানান, যেকোনো প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হবে– ১. ভ্যালু ফর মানি, ২. রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট, ৩. কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ৪. পরিবেশগত সুরক্ষা।

বিনিয়ন্ত্রণকরণ

ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে অর্থমন্ত্রী ‘বিনিয়ন্ত্রণকরণ’ নীতির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র যেন বিনিয়োগের প্রতিবন্ধক না হয়ে সহায়ক হয়, সেজন্য অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা হবে। প্রতিটি সেবা প্রদানের সময়সীমা সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।’

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বাজেটের সাফল্য ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটাতে আমরা ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড ও কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করেছি। সঠিক নেতৃত্ব ও জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।’

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪