রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: একসময় স্বপ্ন ছিল জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটার হওয়ার। বাঁহাতি লেগ স্পিনে (চায়নাম্যান) ছিল দক্ষতা, অনুশীলন করতেন স্টেডিয়ামে, নেট বোলার হিসেবে বল করেছেন জাতীয় দলের খেলোয়াড়দেরও। কিন্তু সেই সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার ডেভিড ইমন এখন চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের আলোচিত নাম। পুলিশের দাবি, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রাম শহর থেকে রাউজান পর্যন্ত এলাকায় অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনার অন্যতম নিয়ন্ত্রক তিনি।
বুধবার (২৯ জুলাই) যশোর শহরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিড ইমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, তিনি চার দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছিলেন এবং অভিযানের খবর পেয়ে আবারও ভারতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (এডিআইজি) নাজিমুল হক জানান, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন ইমন।
ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তার বাবা মো. মুসা ওমানপ্রবাসী ছিলেন, কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ঝোঁক ছিল ইমনের। কাঞ্চননগর থেকে সাইকেলে করে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে গিয়ে অনুশীলন করতেন তিনি। পরে নগরের অক্সিজেনে খালার বাসায় থেকে নিয়মিত ক্রিকেট প্রশিক্ষণ শুরু করেন। খেলতেন চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে এবং কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে অনুশীলন করতেন।
চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমির সাবেক কোচ আমিনুল হক বলেন, ইমন খুব ভালো ক্রিকেট খেলতেন। বাঁহাতি লেগ স্পিনার হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। ব্যাটিংয়েও দক্ষতা ছিল। জাতীয় দলের খেলোয়াড় কিংবা বিদেশি দলের খেলোয়াড়রা চট্টগ্রামে এলে নেট অনুশীলনে তাকে বল করতে দেখা যেত। তার সামনে ভালো সম্ভাবনা ছিল। তবে ২০২০ সালের পর তাকে আর ক্রিকেট মাঠে দেখা যায়নি।
পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নগরের রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর কলেজে ভর্তি হলেও এইচএসসি পরীক্ষা দেননি ইমন।
২০২০ সালে করোনার পর তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এ সময় চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তৈয়বের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
২০২২ সালে ওমানে যান ইমন। প্রায় এক বছর পর দেশে ফিরে আসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে নগরের বায়েজীদ বোস্তামী এলাকার আতুরার ডিপো এলাকায় অবস্থান শুরু করেন। সেখানেই শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় বলে পুলিশ জানায়।
পুলিশের দাবি, ৫ আগস্টের পর নগরের অক্সিজেন এলাকায় ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে সক্রিয় ভূমিকার কারণে ইমন বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের নজরে আসেন।
পুলিশ বলছে, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে। ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদা দাবির জন্য ইমন নিয়মিত ফোন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে নগরের বায়েজীদ বোস্তামী থানা শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজ উদ্দিনকে ফোন করে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তিকে হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবি করতেন। হুমকিতে বলা হতো, ‘গুলি করে পুরো শরীর ভোমরার বাসা করে দেওয়া হবে’ এমন ভয়ভীতি দেখানো হতো।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, হাটহাজারীর জোড়া খুন এবং চান্দগাঁওয়ের আফতাব হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায় ইমনের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে।
এ ছাড়া ১৩ জুলাই নগরের বাকলিয়া অ্যাকসেস রোড এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায়ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে ফোন করে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, ফোনে নিজেকে ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে বলা হয়, ব্যবসা করতে হলে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে।
সন্ত্রাসের পথ বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ইমন বলেন, ছোটবেলা থেকে তার ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হওয়া, না হলে বড়লোক হওয়া। বড়লোক হওয়ার জন্যই তিনি এই পথে এসেছেন বলে জানান।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ইমন ফোনে এমনভাবে কথা বলেন যে মানুষ সহজেই ভয় পেয়ে যায়। তার অস্ত্র চালানোর দক্ষতাও রয়েছে।
অন্যদিকে, ফটিকছড়ির স্থানীয়রা বলছেন, যে ছেলে একসময় ক্রিকেট মাঠে এলাকার সুনাম বাড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিল, তার নাম এখন জড়িয়ে গেছে সন্ত্রাস ও অপরাধের সঙ্গে—যা এলাকাবাসীর জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম