মাগুরা প্রতিনিধি: অযত্ন-অবহেলা ও দীর্ঘদিনের সংস্কারের অভাবে মাগুরার শ্রীপুরে বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান ছান্দসিক কবি কাজী কাদের নওয়াজের স্মৃতিবিজড়িত কবি ভবনটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। শতবর্ষী এই দ্বিতল ভবনের বিভিন্ন স্থান থেকে ইট, সুরকি ও চুন খসে পড়ছে। দ্বিতীয় তলার ছাদে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত, ঝরে পড়ছে টালি। যেকোনো সময় ভবনটি ধসে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
মাগুরা জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে শ্রীপুর উপজেলা সদরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কুমার নদের তীরে মুজদিয়া গ্রামে কবির স্মৃতিবিজড়িত এ ভবন অবস্থিত। ভবনের পাশের পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন কবি কাজী কাদের নওয়াজ। ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’, ‘মা’ ও ‘হারানো টুপি’র মতো কালজয়ী কবিতার স্রষ্টা হিসেবে বাংলা সাহিত্যে তাঁর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।
প্রায় ৯৯ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত বহু কক্ষবিশিষ্ট ভবনটির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ছাদ ফুটো হয়ে যাওয়ায় রোদ-বৃষ্টিতে কাঠের দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ছাদের বিভিন্ন স্থানে জন্মেছে গাছপালা। নিচতলার অধিকাংশ কক্ষও জরাজীর্ণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কবির স্মৃতি সংরক্ষণে নিচতলার একটি কক্ষ সাময়িকভাবে সংস্কার করে সেখানে ‘কবি কাজী কাদের নওয়াজ স্মৃতি পাঠাগার’ গড়ে তোলা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কবির শেষ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই ভবন ও এর আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে। কুমার নদের তীরে নির্জন এই বাড়িতে বসেই তিনি অসংখ্য ছড়া ও কবিতা রচনা করেছেন। কবির মৃত্যুর পর তাঁর সৃষ্টিকর্ম ও স্মৃতিবিজড়িত ভবনটিই হয়ে আছে তাঁর উপস্থিতির অন্যতম নিদর্শন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ভবনটি সংস্কারের অভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কবির স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
কাজী কাদের নওয়াজের ভাতিজা কাজী মাজেদ নওয়াজ বলেন, “প্রকৃত অর্থে যদি বাড়িটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয় কিংবা সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটি অধিগ্রহণ করতে চায়, তাহলে পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করব।”
কবি কাজী কাদের নওয়াজ ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সম্পাদক শেখ মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ভবনটির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। কবির স্মৃতি ধরে রাখতে ভবন ও তাঁর কবর সংস্কার করা জরুরি। দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে যেকোনো সময় ভবনটি ভেঙে পড়তে পারে। তিনি কবি ভবনটি সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
কাজী কাদের নওয়াজ ১৯০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশে আসার পর তিনি ঢাকার নবাবপুরের নবকুমার ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৫১ সালে দিনাজপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৬ সালে অবসর নিয়ে মাগুরায় ফিরে আসেন এবং শ্রীপুর উপজেলার মুজদিয়া গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরে তিনি শ্রীপুর মহেশচন্দ্র পাইলট উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথভাবে ভবনটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা গেলে এটি শুধু কবির স্মৃতি রক্ষার নিদর্শনই হবে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কাজী কাদের নওয়াজের জীবন, সাহিত্যকর্ম, মানবিক মূল্যবোধ ও দেশাত্মবোধ তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক স্থানে পরিণত হতে পারে।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ