রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: বাসভাড়া দেওয়ার সময় ইসমাইল হোসেনের (৫০) লুঙ্গির কোচে থাকা টাকার বান্ডিল নজরে পড়ে বাসের সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমনের। সেই টাকা দেখেই ইসমাইলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। পরে বাসচালকের সঙ্গে যোগসাজশ করে ইসমাইলকে হত্যা করে তার কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। হত্যার পর লাশ ফেলে রাখা হয় রাজধানীর বনানীর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর।
ইসমাইল হত্যার ঘটনায় বাসচালকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ‘রাজ ক্ল্যাসিক’ পরিবহনের বাসচালক সোহেল রানা (৪১), সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) এবং হেলপার মো. মনির হোসেন (১৯)।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মিন্টো রোডে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন।
পুলিশ জানায়, শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকাল পৌনে ৯টার দিকে বনানী থানাধীন এয়ারপোর্টগামী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকায় এক ব্যক্তির লাশ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারের সময় নিহত ব্যক্তির মুখ ও দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে বাঁধা ছিল। গলায়ও কালো দাগ দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে বিষয়টি রহস্যজনক হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করে পুলিশ।
সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে লাশটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। নিহতের নাম ইসমাইল হোসেন। পরিবারের সদস্যরা থানায় গিয়ে লাশের ছবি দেখে তার পরিচয় নিশ্চিত করেন।
এ ঘটনায় নিহত ইসমাইলের ছেলে বাদী হয়ে বনানী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
পুলিশের ভাষ্য, জামালপুরের নিজ গ্রাম থেকে জমি বিক্রির পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে যাচ্ছিলেন ইসমাইল। তার ছেলে হাসান জীরানী বাসস্ট্যান্ডে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু বাবার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়ার পর থেকেই তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
লাশ উদ্ধারের পর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে মাঠে নামে পুলিশ। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও আশপাশের বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ শুরু করা হয়। একপর্যায়ে একটি বাসের গতিবিধি পুলিশের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়।
এরপর অভিযান চালিয়ে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ‘রাজ ক্ল্যাসিক’ পরিবহনের বাসটি জব্দ করা হয়। বাস থেকে সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন এবং হেলপার মো. মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পৃথক অভিযান চালিয়ে বাসচালক সোহেল রানাকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মো. ফারুক হোসেন জানান, শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জামালপুরের দিকপাই বাসস্ট্যান্ড থেকে যাত্রী হিসেবে ওই বাসে ওঠেন ইসমাইল। কিছুক্ষণ পর বাসের সুপারভাইজার সাজু তার কাছে ভাড়া চান। ইসমাইল তখন লুঙ্গির কোচ থেকে টাকা বের করে ভাড়া পরিশোধ করেন।
ভাড়া দেওয়ার সময়ই ইসমাইলের লুঙ্গির কোচে থাকা বেশ কিছু টাকা সুপারভাইজারের নজরে পড়ে। বিষয়টি তিনি বাসচালককে জানান। ইসমাইলের কাছে বিপুল পরিমাণ টাকা রয়েছে এবং তিনি ব্যবসায়ী হতে পারেন। এমন ধারণা থেকে তাকে টার্গেট করা হয়।
এরপর ইসমাইলের কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন বাসচালক ও সুপারভাইজার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চান্দুরা বাসস্ট্যান্ডে ইসমাইলকে নামানো হয়নি। অন্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হলেও ইসমাইলকে বাসে রেখেই ঢাকার দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখা হয়।
পুলিশ জানায়, একপর্যায়ে বাসের সুপারভাইজার ও হেলপার মিলে ইসমাইলের মুখ ও দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। এরপর তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মো. ফারুক হোসেন বলেন, ইসমাইলের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর বাসটি এয়ারপোর্ট থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে বনানীর দিকে আসে। পরে ইউটার্ন করে আবার এয়ারপোর্টের দিকে যাওয়ার সময় ইসমাইলের লাশ এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে রেখে চলে যান আসামিরা।
পুলিশ জানায়, ইসমাইলের কাছে জমি বিক্রির পাঁচ লাখ টাকা ছিল। তবে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পুরো টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেননি। তারা প্রায় আড়াই লাখ টাকা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার বলেন, গ্রেপ্তার তিনজনই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের ভূমিকা, টাকা উদ্ধারের বিষয় এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না এসব খতিয়ে দেখতে তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য, ইসমাইলকে বাসের অন্য যাত্রীদের সঙ্গে নির্ধারিত স্থানে নামিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাকে ঘুমিয়ে পড়তে বলা হয় এবং গন্তব্যে পৌঁছালে ডেকে নামিয়ে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। ইসমাইল ঘুমিয়ে পড়ার পর একে একে অন্য যাত্রীদের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর বাসটি ফাঁকা হয়ে গেলে নির্ধারিত গন্তব্যে না নামিয়ে ইসমাইলকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন বাসের কর্মীরা।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম