রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: রাজধানীর মিরপুরে রাতের আঁধারে মুখোশধারীদের একটি বড় দলের হামলায় টিকাদান ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র তছনছ এবং লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে হামলাকারীরা কেন্দ্রটির বিভিন্ন কক্ষ ও স্থাপনায় ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অর্থ, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মূল্যবান যন্ত্রপাতি নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
অভিযোগ রয়েছে, হামলার পর কেন্দ্রটির দখলও নেওয়া হয়। সেখানে স্থানীয় একটি দোকানদার সমিতির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন কর্মকর্তারা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১২টার দিকে রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে এ ঘটনা ঘটে। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি জানান কেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার।
ডা. নাসরিন আখতারের দাবি, প্রায় ২৫০ জনের একটি মুখোশধারী দল ‘সম্মাননা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর ব্যানারে কেন্দ্রটিতে হামলা চালায়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা প্রথমে সেখানে দায়িত্ব পালনরত দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে। এরপর তারা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে বিভিন্ন কক্ষ ও স্থাপনায় ভাঙচুর এবং লুটপাট চালায়। পরবর্তীতে হামলাকারীরা কেন্দ্রটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষকে সেখানে প্রবেশে বাধা দেয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ডা. নাসরিন আখতার জানান, হামলাকারীরা কেন্দ্র থেকে সরকারি ইপিআইয়ের টিকা, টিকা দেওয়ার রেজিস্টার ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন সরঞ্জাম ও উপকরণ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া নগদ প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনও নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ, কেন্দ্র থেকে একটি জেনারেটর, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, সিসিটিভি ক্যামেরা, তিনটি স্টিলের আলমারি, পাঁচটি স্টিলের ফাইল কেবিনেট, ল্যাবরেটরির বিভিন্ন সরঞ্জাম ও রিএজেন্টও লুট করা হয়েছে। এ ছাড়া দুটি টেলিভিশন, দুটি কম্পিউটার, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টারসহ বিভিন্ন আসবাবপত্রও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালকের দাবি, হামলাকারীরা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কেন্দ্রটির স্থাপনায়ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান তিনি। হামলার পর কেন্দ্রের বিভিন্ন স্থানে ‘সম্মাননা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন ডা. নাসরিন।
তিনি বলেন, শুধু যন্ত্রপাতি ও মালামালের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণই আনুমানিক দেড় কোটি টাকা। রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর এলাকার দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রায় ৫০ বছর ধরে এখানে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।
ডা. নাসরিন বলেন, শনিবার থেকে সরকারি হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেন্দ্রটি দখল, ভাঙচুর ও লুটপাটের কারণে হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনসহ প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
তার দাবি, এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এলাকার দরিদ্র ও অসহায় মানুষ এবং শিশুরা। ঘটনার পর কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলেও জানান ডা. নাসরিন আখতার।
তিনি বলেন, এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা নয়; দেশের দরিদ্র, শিশু ও অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের ওপরও আঘাত।
ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রটির পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ দিয়ে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পুনরায় চালুরও দাবি জানানো হয়েছে।
ঘটনার পর রাজধানীর শাহ আলী থানায় মামলা করা হয়েছে। শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম জানান, মামলায় হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তিনি জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশ, চুরি, হুমকি এবং দেড় কোটি টাকার বেশি ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
ঘটনাটি তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম