স্টাফ রিপোর্টার: ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও পরিবেশ দূষণকারী যানবাহন ধ্বংস (স্ক্র্যাপ) ও রিসাইক্লিংয়ের জন্য নতুন নীতিমালা জারি করেছে সরকার। অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অতিক্রান্ত কোনো মোটরযান স্ক্র্যাপ না করলে সংশ্লিষ্ট মালিকের নামে নতুন বা পুরোনো কোনো মোটরযান নিবন্ধন দেওয়া হবে না।
‘মোটরযান স্ক্র্যাপিং ও রিসাইক্লিং নীতিমালা, ২০২৬’ শিরোনামে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এ নীতিমালা জারি করেছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ধারা ১২৪(১)(থ)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জনস্বার্থে নীতিমালাটি প্রণয়ন করা হয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, নীতিমালাটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
স্ক্র্যাপযোগ্য গাড়ি
নীতিমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অতিক্রান্ত ও চলাচলের অযোগ্য মোটরযান স্ক্র্যাপযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ ছাড়া সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে অকেজো ঘোষিত যানবাহনও এর আওতায় পড়বে। আগুন, বিস্ফোরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনায় এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি, যা মেরামত করে চালানো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, সেগুলোও স্ক্র্যাপ করা যাবে।
এ ছাড়া আদালত বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের আদেশে নিষ্পত্তিকৃত যানবাহন, মালিকের স্বেচ্ছায় স্ক্র্যাপের জন্য দেওয়া গাড়ি, অননুমোদিতভাবে উৎপাদিত মোটরযান এবং বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া আকৃতি বা প্রকৃতি পরিবর্তন করা যানবাহন স্ক্র্যাপযোগ্য হবে।
টানা পাঁচ বছরের বেশি সময় ফিটনেস খেলাপি থাকা মোটরযানও স্ক্র্যাপের আওতায় আসবে। পাশাপাশি, কোনো গাড়ির নিঃসরণ এক মাসে তিনবার ‘বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২’-এর নির্ধারিত মান অতিক্রম করলেও সেটি স্ক্র্যাপযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত মোটরযানও এ তালিকায় থাকবে।
নতুন গাড়ি নিবন্ধনে বাধা
নীতিমালায় বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অতিক্রান্ত মোটরযান স্ক্র্যাপ করা ছাড়া সংশ্লিষ্ট মালিক নিজের নামে নতুন বা পুরোনো কোনো মোটরযানের নিবন্ধন নিতে পারবেন না। তবে স্ক্র্যাপযোগ্য গাড়ি স্ক্র্যাপ করার জন্য মালিকের আবেদন কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করলে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন বা পুরোনো মোটরযান নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
স্ক্র্যাপ যেভাবে হবে
স্ক্র্যাপযোগ্য গাড়ির মালিককে মূল কাগজপত্রসহ নির্ধারিত ফরমে সংশ্লিষ্ট মোটরযান নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে। পরিত্যক্ত, ফিটনেসবিহীন বা দূষণকারী গাড়ির ক্ষেত্রে আদালত, পুলিশ বা কাস্টমস কর্তৃপক্ষও বিআরটিএকে স্ক্র্যাপের জন্য অনুরোধ করতে পারবে।
আটক করা কোনো গাড়ি স্ক্র্যাপ করার আগে মালিককে কমপক্ষে ১৫ দিনের নোটিশ দিতে হবে এবং লিখিত আপত্তির সুযোগ দিতে হবে। তবে অননুমোদিতভাবে উৎপাদিত মোটরযানের ক্ষেত্রে এ নোটিশ প্রযোজ্য হবে না।
অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার আগেই কোনো গাড়ি স্ক্র্যাপ করতে চাইলে মালিককে আগের সব কর ও ফি পরিশোধ করতে হবে। তবে অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অতিক্রান্ত গাড়ির ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ের কোনো কর বা ফি দিতে হবে না।
অর্থনৈতিক আয়ুষ্কালের মধ্যে থাকা গাড়ির বকেয়া কর ও ফি নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। তা না হলে স্ক্র্যাপ বা নিলাম মূল্য থেকে বকেয়া অর্থ কেটে নেওয়া হবে। এরপরও বকেয়া থাকলে ‘পাবলিক ডিমান্ডস রিকভারি অ্যাক্ট ১৯১৩’ অনুযায়ী তা আদায় করা হবে।
স্ক্র্যাপ ভেন্ডর নিয়োগ
নীতিমালা অনুযায়ী, উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এক বা একাধিক স্ক্র্যাপ ভেন্ডর নিয়োগ করবে কর্তৃপক্ষ। ভেন্ডরকে বিআরটিএতে নিবন্ধিত হতে হবে। এ ছাড়া গ্যাস কাটার, ক্রেন, শ্রেডার মেশিন, রেকার ও হাইড্রোলিক প্রেস মেশিনসহ প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ছাড়পত্রও বাধ্যতামূলক। একজন স্ক্র্যাপ ভেন্ডরের কমপক্ষে ৫০টি মোটরযান রাখার সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হবে।
স্ক্র্যাপের সময় গাড়ির চেসিস ও ইঞ্জিন নম্বর এমনভাবে নষ্ট করতে হবে, যাতে সেগুলো অন্য কোনো গাড়িতে ব্যবহার করা না যায়। কার্যাদেশ পাওয়ার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে স্ক্র্যাপ সম্পন্ন করতে হবে।
স্ক্র্যাপ শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট গাড়ির নিবন্ধন নম্বর বাতিল করে বিআরটিএর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এরপর সাত দিনের মধ্যে মালিককে ‘ভেহিক্যাল স্ক্র্যাপিং সার্টিফিকেট’ দেওয়া হবে।
থাকছে আর্থিক প্রণোদনা
নীতিমালায় বাণিজ্যিক মোটরযানের মালিকদের জন্য আর্থিক সুবিধার সুযোগ রাখা হয়েছে। স্ক্র্যাপ সার্টিফিকেটের বিপরীতে নতুন বাণিজ্যিক মোটরযান নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মালিক বা বৈধ উত্তরাধিকারীকে সরকার সহজ শর্তে ও স্বল্পসুদে ঋণ বা আর্থিক প্রণোদনা দিতে পারবে।
আপিলের সুযোগ
নীতিমালার আওতায় কোনো সিদ্ধান্তে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে সাত দিনের মধ্যে আপিল করা যাবে। বিআরটিএ চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আপিল বোর্ড এ আপিল নিষ্পত্তি করবে। আপিল পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে তা নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে।
স্ক্র্যাপের মূল্য নির্ধারণে বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং)-এর নেতৃত্বে ‘স্ক্র্যাপমূল্য নির্ধারণ কমিটি’ এবং নিলামের জন্য পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট)-এর নেতৃত্বে ‘নিলাম কমিটি’ গঠন করা হবে।
নীতিমালা লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নতুন এ নীতিমালার মাধ্যমে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে জারি করা পূর্বের নীতিমালা রহিত করা হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব