| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

মালদ্বীপ, কাতার, তুরস্কসহ ১০ দেশের সংস্কৃতি এক গ্রামে

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ২৪, ২০২৬ ইং | ১৫:৪৭:৪০:অপরাহ্ন  |  ৩৪৪ বার পঠিত
মালদ্বীপ, কাতার, তুরস্কসহ ১০ দেশের সংস্কৃতি এক গ্রামে

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: কাচের বাক্সে সারি সারি পুতুল। কারও পরনে রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক, কারও মাথায় বিশেষ ধরনের টুপি। কোনো পুতুলে মালদ্বীপের সংস্কৃতি, কোনোটিতে কাতার কিংবা তুরস্কের ঐতিহ্যের ছাপ। একই গ্যালারিতে রয়েছে উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, কেনিয়া, আজারবাইজান, সেনেগাল, বাংলাদেশ ও ভারতের পুতুল। আবার একটু এগোলেই দেখা মেলে দল বেঁধে বসে থাকা মানুষের প্রতিকৃতি, কাঠের খেলনা গাড়ি, লাটিম ও মার্বেলের। পুতুলের সাজে বিশ্বসংস্কৃতির পরিচয়, আর লোকজ খেলনায় ফুটে উঠেছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা শৈশব।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পূর্ব আকচায় বেসরকারি সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) উদ্যোগে গড়ে ওঠা লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘরের লোকজ খেলনা গ্যালারিতে মিলেছে এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন। এখানে একদিকে বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরা হয়েছে, অন্যদিকে দেশীয় খেলনা ও মানুষের প্রতিকৃতির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়েছে গ্রামীণ জীবনের নানা স্মৃতি।

গ্যালারির আন্তর্জাতিক পুতুলের সংগ্রহে রয়েছে মালদ্বীপ, কেনিয়া, কাতার, তুরস্ক, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, আজারবাইজান, সেনেগাল, বাংলাদেশ ও ভারতের পুতুল। পোশাক, রং ও সাজসজ্জার ভিন্নতা প্রতিটি পুতুলকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। এসব পুতুলের মাধ্যমে দর্শনার্থীরা বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, সংস্কৃতি ও জীবনযাপন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

জাদুঘরের এমআইএস কাম অ্যাকাউন্ট্যান্ট জীবন চন্দ্র রায় বলেন, ‘এখানে প্রদর্শিত পুতুলগুলো কেবল সাধারণ পুতুল নয়; এগুলো বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। দর্শনার্থীরা যেন বিভিন্ন দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই আন্তর্জাতিক পুতুলগুলো প্রদর্শন করা হয়েছে। পুতুলগুলোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও সাজসজ্জা দেখলেই সংশ্লিষ্ট দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।’

পুতুলের পোশাকে দেশ-বিদেশের গল্প

একেকটি পুতুল যেন একেকটি দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জানালা। কোথাও উজ্জ্বল রঙের পোশাক, কোথাও বিশেষ ধরনের মাথার আবরণ, আবার কোথাও পোশাকের নকশায় ফুটে উঠেছে স্বতন্ত্র ঐতিহ্য। একই গ্যালারিতে বিভিন্ন দেশের পুতুল পাশাপাশি থাকায় দর্শনার্থীরা সেসব দেশের পোশাক ও সাজসজ্জার বৈচিত্র্য তুলনা করে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।

বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের কাছে এ আয়োজন বইয়ের বাইরের জগৎকে জানার একটি ভিন্ন মাধ্যম। ভূগোলের বইয়ে কোনো দেশের নাম পড়া আর সেই দেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের নমুনা সামনে থেকে দেখার অভিজ্ঞতা এক নয়। পুতুলগুলো সেই জানার সুযোগ তৈরি করছে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কচুবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলে, ‘এখানে বিভিন্ন দেশের পুতুল দেখে ভালো লেগেছে। আগে বইয়ে বিভিন্ন দেশের নাম পড়েছি, কিন্তু তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক এভাবে একসঙ্গে দেখার সুযোগ হয়নি। পুতুলগুলোর সাজসজ্জা দেখে দেশগুলোর সংস্কৃতি সম্পর্কে নতুন কিছু জানতে পেরেছি।’

একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সবুজ রানা বলে, ‘আমাদের বাবা-চাচারা ছোটবেলায় কী ধরনের খেলনা দিয়ে খেলতেন, তা তাঁদের কাছে শুনেছি। এখানে পুরোনো দিনের খেলনা দেখে সেই কথাগুলো মনে পড়ছে। এখনকার খেলনার সঙ্গে এগুলোর অনেক পার্থক্য।’

দল বেঁধে বসা প্রতিকৃতিতে গ্রামবাংলার স্মৃতি

আন্তর্জাতিক পুতুলের পাশাপাশি গ্যালারির আরেকটি অংশে রয়েছে দলবদ্ধভাবে বসে থাকা নারী-পুরুষের প্রতিকৃতি। কেউ মুখোমুখি, কেউ আবার অন্যের দিকে ফিরে বসে আছেন। তাঁদের বসার ভঙ্গিতে ফুটে উঠেছে একসঙ্গে বসে গল্প করা, হাসি-আনন্দ ভাগাভাগি করা এবং অবসর কাটানোর চিরচেনা দৃশ্য।

একসময় গ্রামের উঠানে, বাড়ির বারান্দায় কিংবা গাছের ছায়ায় মানুষ দল বেঁধে বসে গল্প করতেন। চলত হাসি-ঠাট্টা, সুখ-দুঃখের কথা ও নানা বিষয়ে আলোচনা। প্রতিবেশীদের সঙ্গে এমন মেলামেশা ছিল গ্রামীণ সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

জীবন চন্দ্র রায় বলেন, পুতুলের দলবদ্ধ বসার দৃশ্যের মধ্য দিয়ে আবহমান গ্রামবাংলার সামাজিক জীবন ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে। অতীতে গ্রামের মানুষ এভাবেই একসঙ্গে বসে গল্প করতেন। ডিজিটাল যুগে মানুষের অবসর কাটানোর ধরন বদলে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে এমন দৃশ্য আর আগের মতো পরিচিত নয়।

ঠাকুরগাঁও শহরের বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইসরাত ফারজানা বলে, ‘পুতুলগুলোকে গোল হয়ে বসে থাকতে দেখে মনে হচ্ছে, তারা সবাই মিলে গল্প করছে। আমাদের বড়দের কাছে শুনেছি, আগে মানুষ অবসর সময়ে উঠানে বা বাড়ির সামনে একসঙ্গে বসে গল্প করত। এখানে সেই সময়ের একটি ছবি দেখতে পেলাম।’

একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারিয়া জাহান বলে, ‘আমরা এখন অবসর সময়ে অনেকেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। কিন্তু আগের দিনের মানুষেরা কীভাবে একসঙ্গে সময় কাটাতেন, এই প্রতিকৃতিগুলো দেখে তা কল্পনা করা যায়। এগুলো দেখে পুরোনো দিনের জীবনযাপন সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।’

লাটিম-মার্বেলে ফিরে দেখা শৈশব

গ্যালারির অন্য অংশে সাজানো রয়েছে কাঠের খেলনা গাড়ি, ঠেলনা গাড়ি, লাটিম, মার্বেলসহ নানা ধরনের লোকজ খেলনা। একসময় গ্রামবাংলার হাটবাজার ও মেলায় এসব খেলনা পাওয়া যেত। শিশুদের আনন্দের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল এগুলো।

সুতলি দিয়ে লাটিম পেঁচিয়ে মাটিতে ছুড়ে ঘোরানো হতো। কোনো কোনো খেলায় নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে প্রতিপক্ষের লাটিমে আঘাত করার চেষ্টা চলত। মার্বেল খেলাতেও ছিল নানা কৌশল ও প্রতিযোগিতা। সামান্য কয়েকটি মার্বেল কিংবা একটি লাটিম ঘিরেই বন্ধুদের মধ্যে জমে উঠত আনন্দের আসর।

জাকির হোসেন নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণা করে জানান, লাটিম দিয়ে ‘গদ-গদ’ নামে একটি খেলা খেলতেন তাঁরা। সুতলি দিয়ে লাটিম পেঁচিয়ে ঘুরিয়ে নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে প্রতিপক্ষের লাটিমে আঘাত করার চেষ্টা চলত। শৈশবে এক টাকায় মার্বেল কিনে খেলার স্মৃতিও এখনো তাঁর মনে রয়েছে।

শহরের বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নির্ঝর আহমেদ বলে, ‘লাটিম ও কাঠের খেলনা গাড়ি দেখে ভালো লেগেছে। আমাদের কাছে এখন অনেক ধরনের আধুনিক খেলনা আছে। কিন্তু আগের দিনে শিশুরা কীভাবে এসব সাধারণ খেলনা দিয়ে আনন্দ পেত, তা জানতে পারছি। পরিবারের বড়দের কাছে শোনা শৈশবের গল্পের সঙ্গে এখানকার খেলনাগুলো মিলে যাচ্ছে।’

পুরোনো দিনের এসব খেলনা প্রবীণদের মনে ফিরিয়ে আনতে পারে ফেলে আসা শৈশবের স্মৃতি। অন্যদিকে, নতুন প্রজন্ম জানতে পারে তাদের বাবা-চাচা কিংবা আগের প্রজন্মের মানুষের বিনোদনের ধরন। এভাবেই খেলনাগুলো এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আরেক প্রজন্মের পরিচয় ঘটাচ্ছে।

ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যাপক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘরের লোকজ খেলনা গ্যালারিতে পাশাপাশি জায়গা পেয়েছে দেশ-বিদেশের সংস্কৃতি ও বাংলার অতীত জীবন। একদিকে ১০ দেশের পুতুলে ফুটে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, অন্যদিকে দেশীয় খেলনা ও মানুষের প্রতিকৃতিতে ধরা পড়েছে গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি।

ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মনোতোষ কুমার দে বলেন, একটি পুতুল দর্শনার্থীকে ভিন্ন দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ দেয়। একটি লাটিম কিংবা কাঠের খেলনা ফিরিয়ে নিয়ে যায় ফেলে আসা শৈশবে। ফলে গ্যালারিটি শুধু প্রদর্শনীর স্থান নয়, অতীতকে জানা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়ারও একটি ক্ষেত্র। পুতুলের পোশাকে মেলে দূরের দেশের পরিচয়, আর লোকজ খেলনায় খুঁজে পাওয়া যায় নিজের মাটি ও শৈশবের গল্প।

রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪