ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে (পিওকে) জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটিকে (JAAC) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চেয়েছেন জাতিসংঘের ছয়জন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ। তাঁদের আশঙ্কা, সংগঠনটির রাজনৈতিক ও মানবাধিকারবিষয়ক কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের লঙ্ঘন হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তাঁরা।
আলোচনার সঙ্গী থেকে নিষিদ্ধ সংগঠন
চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ৫ জুন আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরের (এজেকে) স্বরাষ্ট্র বিভাগ সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০১৪-এর প্রথম তফসিলে JAAC-এর নাম অন্তর্ভুক্ত করে। এর মাধ্যমে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকারি প্রজ্ঞাপনে সংগঠনটির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকা, নৈরাজ্য সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ আনা হয়।
তবে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কীভাবে সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার আইনি মানদণ্ড পূরণ হয়েছে, তা পাকিস্তান সরকার ব্যাখ্যা করেনি।
বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে JAAC-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং সংগঠনটির সঙ্গে একাধিক চুক্তিও করেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্বাক্ষরিত মুজাফফরাবাদ চুক্তিও রয়েছে।
এমনকি ২০২৬ সালের ২৮ মে আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্য সচিবের কার্যালয় থেকে আইনসভায় কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত আসন নিয়ে আলোচনার জন্য JAAC প্রতিনিধিদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।0.
আলোচনার অংশীদার হিসেবে বিবেচিত একটি সংগঠনকে হঠাৎ নিষিদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা।
বিক্ষোভ দমনে ৯৬ জন নিহতের অভিযোগ
জাতিসংঘের চিঠিতে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে বিক্ষোভে অন্তত ৯৬ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া পুলিশের ছয় সদস্য ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যের মৃত্যুর খবরও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিক্ষোভকারীদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং সরাসরি গুলি ব্যবহার করেছে। এমনকি কয়েকটি ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের আগে তাঁদের স্বজনদের দিয়ে মৃত ব্যক্তিদের সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করে নথিতে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার অভিযোগও এসেছে।
এ ছাড়া JAAC-এর সদস্য, সমর্থক ও সাংবাদিকসহ অন্তত ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা পরিচালনার তথ্যও পেয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিক্ষোভের সময় ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ বা সীমিত করা, কারফিউ জারি, হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ রাখা এবং আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করার জন্য নির্বিচারে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা যায় না। অন্য কারও জীবন রক্ষায় আসন্ন হুমকি মোকাবিলার জন্য একান্ত অপরিহার্য হলেই কেবল ইচ্ছাকৃত প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে।
বিক্ষোভে নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনাগুলোর বিষয়ে দ্রুত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
২০৫ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বিধিনিষেধ
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, নারীসহ ২০৫ জনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা।
চিঠিতে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয়পত্র স্থগিত বা বাতিল, ব্যাংক হিসাব ও পাসপোর্ট জব্দ এবং চলাচলের বিষয়ে পুলিশকে নিয়মিত অবহিত করার মতো বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপের ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিকিৎসাসহ জরুরি সেবা পাওয়ার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে তাঁদের চলাচলের স্বাধীনতা এবং জীবিকা নির্বাহের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আটটি বিষয়ে পাকিস্তানের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে জাতিসংঘ
জাতিসংঘের ছয় বিশেষজ্ঞ পাকিস্তান সরকারের কাছে আটটি বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে JAAC-কে নিষিদ্ধ ঘোষণার আইনি ভিত্তি, সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকারের সুযোগ, বিক্ষোভে প্রাণহানির তদন্ত, নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগ, গ্রেপ্তার ও আটক ব্যক্তিদের অবস্থা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থায় বিধিনিষেধ এবং চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার ক্ষেত্রে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন করার অধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক, মানবাধিকারকর্মীবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক এবং নির্বিচার আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের চেয়ারম্যান-র্যাপোর্টিয়ার।
পাকিস্তান সরকারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিক্ষোভে ৯৬ জনের মৃত্যুর অভিযোগ, অধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট ও মোবাইল সেবা সীমিত করা এবং পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে ২০০ জনের বেশি মানুষের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা।
২০২৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পাঠানো ওই চিঠির স্মারক নম্বর AL PAK 4/2026। এতে JAAC-কে নিষিদ্ধ সংগঠন ঘোষণার আইনি ও বাস্তব ভিত্তি, এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ এবং বিক্ষোভ দমনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত সম্পর্কে পাকিস্তান সরকারের কাছে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম