রিয়াজুল হক : লোভ এক ধরনের ভয়াবহ মানসিক দুর্বলতা, যার মোহে পড়লে মানুষ নিজের বিবেক-বুদ্ধি, মূল্যবোধ, এমনকি ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যও ভুলে যায়। পৃথিবীর যত অন্যায়, দুর্নীতি, অপরাধ, প্রতারণা, জঘন্যতম কাজের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো লোভ। লোভের কারণে একজন সৎ মানুষ অসৎ হয়ে যায়, ভালো মানুষ খারাপ হয়ে যায়। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সব ক্ষেত্রেই লোভের ভয়াবহতা স্পষ্ট। লোভ মূলত অর্থ, ক্ষমতা, খ্যাতি, সম্মানের প্রতি অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা। যা মানুষকে প্রয়োজনের বাইরে যেয়ে আরও পেতে প্রলুব্ধ করে। অতিরিক্ত পাওয়ার এই পিপাসাই মানুষকে অসৎ পথে ঠেলে দেয়, বিবেক বোধ ধ্বংস করে দেয়। অনেক সময় মানুষ থেকে অমানুষে পরিণত করে।
লোভ মানুষের ব্যক্তি জীবনে যেমন ক্ষতি করে, তেমনি সমাজেও তার ভয়ংকর প্রতিফলন পড়ে। লোভী ব্যক্তি অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে ঘুষ, দুর্নীতি, চুরি, ডাকাতি, প্রতারণা, ফাঁকি সবকিছুতেই জড়িয়ে যায়। সমাজে বৈষম্য বাড়ে। গরিব আরো গরিব হয়, ধনী আরো ধনী হ । ফলে তৈরি হয় সামাজিক অস্থিরতা, হিংসা, প্রতিহিংসা, বিশৃঙ্খলা। একজন ব্যক্তি যখন অন্যের সম্পদ, অধিকার বা সুযোগকে লোভের বসে দখল করে, তখন সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। বিচারহীনতার সংস্কৃতিও গড়ে ওঠে। কারণ, যারা লোভের কারণে অন্যায় করে, তারা ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে যায়। ফলে দুর্নীতির চক্র কখনোই ভাঙ্গে না।
তবে লোভী মানুষ যে শান্তিতে থাকতে পারে, বিষয়টা কিন্তু তেমন নয়। যারা লোভের ফাঁদে পড়ে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করে, তাদের শান্তিও হারিয়ে যায়। তারা সর্বক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকে, কখন ধরা পড়বে, কখন অপমানিত হবে, কখন সব হারিয়ে যাবে। লোভের কারণে মানুষের মন কলুষিত হয়ে যায়। আমরা অনেক সময় দেখি, কেউ হয়তো দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়েছে । কিন্তু জীবনের একটা সময়ে কারাগার, সামাজিক লাঞ্ছনা কিংবা চরম অবহেলায় মৃত্যুবরণ করেছে।
লোভ থেকে আমাদের মুক্তি প্রয়োজন। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, আমার চাহিদা কী? যা পাচ্ছি, তাতেই কি আমার চলবে? প্রয়োজন আর লোভের পার্থক্য বুঝতে হবে। লোভকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এজন্য যা আছে, তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। আল্লাহর দেওয়া রিজিকের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে হবে। অবৈধ পথের আয় কখনো স্থায়ী শান্তি দেয় না, তাই উপার্জনে সততার বিকল্প নেই। দান-সদকা, মানুষের জন্য কিছু করার মানসিকতা গড়ে তুললে লোভ কমে যায়। কুরআন-হাদিসের চর্চা, আত্মউন্নয়নমূলক বই পড়া, নিয়মিত নামাজ, ধ্যান মনকে সংযত রাখে। নিজেকে সীমিত চাহিদার মধ্যে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন। অহেতুক ভোগ-বিলাসে যাওয়া উচিত নয়। লোভ হচ্ছে এক অতল কুয়ার মতো, যার কোন শেষ নেই। এই লোভ মানুষের বিবেক, নীতি, মূল্যবোধ সবকিছু গ্রাস করে ফেলে। তাই লোভের ফাঁদে পড়া মানে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনা।
আমাদের প্রত্যেকেরই নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, ‘আমি কি লোভের ফাঁদে পড়ছি?’ যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে দ্রæত ফিরে আসুন। কারণ, লোভে পড়ে সুকান্তও নিঃস্ব হয়ে।
লেখক : রিয়াজুল হক
যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।