রিয়াজুল হক : অর্থনৈতিক নানা চাপ যেমন মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ, বিনিয়োগের ঘাটতি কিংবা মূল্যমানের অস্থিরতা ইত্যাদি পরিস্থিতিতে একটি দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা থাকে, সেটি হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বর্তমান বিশ্বে যেসব দেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও টেকসই, সেখানে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করতে পারে।
স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল সুদের হার নির্ধারণ করে না, এটি বাজারে টাকার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখে, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা করে এবং সর্বোপরি একটি দেশের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিরপেক্ষ ও বাস্তবভিত্তিক রাখতে সাহায্য করে। এসব কাজ যদি রাজনৈতিক প্রভাব বা সরকারের নির্দেশনায় পরিচালিত হয়, তাহলে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
তাহলে মনের মধ্যে প্রশ্ন আসতেই পারে, একটি দেশ যদি পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে সেই দেশ কী কী সুবিধা পেতে পারে?
স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সকল চাপ এড়িয়ে মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে পারে। ফলে বাজারে অতিরিক্ত টাকা ছাপার প্রবণতা কমে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক বা সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক মূলত মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।
স্বাধীন ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেয়। এতে সুদহার বা বিনিয়োগ নীতিতে বারবার পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে না, যা ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গা তৈরি করে।
অনেক সময় সরকার রাজনৈতিক কারণে মুদ্রার মান কৃত্রিমভাবে ধরে রাখে। এতে রপ্তানি ও রিজার্ভ, দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বায়ত্তশাসিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক পারিপার্শ্বিক চাপ থেকে মুক্ত থেকে বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী হস্তক্ষেপ করে, যার মাধ্যমে মুদ্রার মানকে স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখা সম্ভব হয়।
আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংকসহ বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা এমন দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়, যাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করে থাকে। এটি একটি দেশের ক্রেডিট রেটিং বাড়াতেও সহায়তা করে।
স্বায়ত্তশাসিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি রাজনীতিমুক্তভাবে কাজ করতে পারে। নির্বাচনী বছর আসলে অনেক দেশে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দিয়ে বেশি ঋণ নেয় বা সুদ হার কমাতে চাপ দেয়। এতে সাময়িক সুবিধা মিললেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক হলে ব্যাংকিং খাতে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি কার্যকর হয়। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়, বাইরের চাপ থাকে না।
একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন মানে শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নয়, বরং এটি একটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং বৈদেশিক আস্থার প্রতীক। মনে রাখতে হবে, একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক মানেই একটি শক্ত ভিতের উপর দাঁড়ানো অর্থনীতি।
লেখক : রিয়াজুল হক,যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক