শাহানুজ্জামান টিটু : ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিআর পদ্ধতি প্রবর্তন করা না হলে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন বর্জন করতে পারে বলে ইতিমধ্যেই দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ইসলামিক দল পিআর পদ্ধতি প্রণয়ে দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে দেশের সর্ববৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। তবে দলটি উচ্চকক্ষে এই পদ্ধতিতে তাদের কোন আপত্তি নেই বলে জানিয়েছে। এই পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরস্পর বিরোধী মন্তব্য থাকলেও সাধারণ মানুষ এই পদ্ধতি সম্পর্কে কতটুকু জানে। আমি এখানে মূলত রাজনৈতিক দলগুলো পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন করবে কি করবে না তা নিয়ে আলোচনা করছি না। এটা সময় বলে দেবে দলগুলো কি সিদ্ধান্ত নেবে।
আমি পিআর পদ্ধতির সুবিধা এবং অসুবিধাগুলো নিয়ে আলোচনা করব। পিআর বলতে বোঝানো হয়েছে Proportional Representation (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি। এটা এমন একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি দলের প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হারের সঙ্গে আনুপাতিকভাবে সংসদে আসন সংখ্যা বন্টন হবে। আর এই সুবিধাটি নিতে চায় জামাতায়াতসহ বিভিন্ন ছোট ছোট রাজনৈতিক দল।
এই পদ্ধতি কিভাবে কাজ করে বা এর বৈশিষ্ট্যগুলোই বা কি ?
ধরা যাক কোন দল যদি মোট ভোটের ৩০% পায় তবে সংসদে তারা প্রায় ৩০% আসন পেতে পারে। এই পদ্ধতিতে সাধারণ ভোটাররা দলের জন্য ভোট দেয়। পরে দলগুলো তালিকা অনুযায়ী প্রার্থী সংসদে পাঠান। এর ফলে ছোট ছোট দলগুলো সংসদে আসন পেতে পারে এক্ষেত্রে বহুদলীয় গণতন্ত্র বা রাজনীতিতে টিকে থাকার একটা সুযোগ তৈরি হয়।
পিআর পদ্ধতিতে কিভাবে সংসদে আসন বন্টন হয় এবং ছোট দলগুলো এর থেকে কি সুবিধা পাবে? উদাহরণ, ধরুন ৩০০ সংসদীয় আসনে নির্বাচন হবে। এতে ছোট বড় মিলিয়ে মোট চারটি দল বা জোট নির্বাচন করছে। মোট ভোটার ১০ কোটি। এর মধ্যে ”এ দল ৪০% ভোট পেয়েছে। তারমানে তারা মোট ভোট পেয়েছে ৪ কোটি। এখন ৩০০ আসনকে ৪০% দিয়ে গুণ করলে তাদের আসন সংখ্যা হবে ১২০টি। একই ভাবে সব চেয়ে ছোট দল ”ডি তারা ভোট পেয়েছে মোট ভোটের ১০% ফলে ৩০০ আসনকে ১০% দিয়ে গুণ করলে তাদের আসন সংখ্যা হবে ৩০টি। একই ভাবে ”বি ৩০% ভোট পেয়ে ৯০ আসন এবং দল সি ২০% ভোট পেয়ে সংসদে তাদের আসন হবে ৬০ আসন। আর এ কারণে জামায়াতসহ কিছু ছোট দল পিআর পদ্ধতি নিয়ে জোরালো দাবি জানাচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থাকে ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট (FPTP) বলা হয়। এই পদ্ধতির নির্বাচনে ছোট রাজনৈতিক দল হয়তো একটিও আসন তারা পেত না, কারণ আসন জেতার জন্য প্রতিটি এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত হতে হয়।
পিআর পদ্ধতি বিশ্বের প্রায় ৯০টি দেশে কোন না কোন ভাবে চালু রয়েছে। সবগুলো দেশ কিন্তু একই ক্যাটাগরির এই পদ্ধতি নেই। আমরা যদি ইউরোপের দিকে দেখি তাহলে সেখানে দেখব জার্মানি নেদারল্যান্ড সুইডেন ডেনমার্ক এসব দেশে এই পদ্ধতি চালু রয়েছে অপরদিকে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল, ইন্দোনেশিয়া এসব দেশেও এই পদ্ধতি চালু আছে। একথায় বিশ্বের ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকার বেশিরভাগ, আফ্রিকার কয়েকটি এবং এশিয়ার কিছু দেশ পি আর পদ্ধতি বা মিশ্র পি আর পদ্ধতি অনুসরণ করে।
এই পদ্ধতিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। ছোট ও বড় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ভোট অনুসারে প্রতিনিধিত্ব পেতে পারে। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ক্ষেত্র তৈরি হয়, এক্ষেত্রে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা সুযোগ পায়। জোট ও সমঝোতার রাজনীতির ক্ষেত্রে দলগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। ফলে গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ থাকে ।
পি আর পদ্ধতির সুবিধার চেয়ে অসুবিধা বেশি বলে আমার মনে হয়ছে। এ বিষয়ে কয়েকটি রেফারেন্স তুলে ধরলাম। এই পদ্ধতির অসুবিধা বা সমস্যা নিয়ে Arend Lijphart (রাজনৈতিক বিজ্ঞানী, Patterns of Democracy, 1999): গবেষণায় বলেছেন PR ব্যবস্থায় সরকার গঠনে সময় বেশি লাগে এবং প্রায়ই জোট ভাঙাগড়ার কারণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়।
André Blais (কানাডিয়ান রাজনৈতিক বিশ্লেষক, The Debate over Electoral Systems, 1991): তার গবেষনায় উল্লেখ করেছেন, PR-এ ছোট দলগুলো সরকারের টিকে থাকার জন্য অস্বাভাবিকভাবে বেশি প্রভাব খাটায়, যা নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির বদলে দরকষাকষি ও সুবিধাবাদী রাজনীতিকে উৎসাহিত করে।
Gallagher & Mitchell (The Politics of Electoral Systems, 2005): তিনি বলেছেন, এই ব্যবস্থার সংসদে অনেক ছোট দলের উপস্থিতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে এবং আইন পাসে ধীরগতি দেখা দেয়।
Pippa Norris (হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, Electoral Engineering, 2004): তিনি বলেছেন, ইউরোপের অনেক দেশে PR ব্যবস্থার কারণে ডানপন্থী চরমপন্থী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী দল সহজেই সংসদে প্রবেশ করেছে, যা মূলধারার রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা এনেছে।
এসব রাজনৈতিক বিশ্লেষণদের গবেষণা থেকে জানা যায় যে বাংলাদেশের মতো দেশে পি আর পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হলে যে সম্ভাব্য অসুবিধা গুলো হবে তার মধ্যে স্থিতিশীল সরকার গঠন সমস্যা, খণ্ডিত রাজনীতি ও দুর্বল শাসন, প্রার্থীর জবাবদিহিতা কমবে , চরমপন্থী দলের উত্থান, ভোটার ও প্রার্থী মধ্যে সম্পর্ক দূরত্ব তৈরি, আইন প্রণয়নে ধীর গতি সহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। PR গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করলেও, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলোদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পদ্ধতির বিষয়ে 11 জুলাই 2025 ডেইলী স্টারে ব্যারিস্টার খান খালিদ আদনান লিখেছেন বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেখানে অনেক দলের বিশ্বাস-অভাব, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে আস্থা সংকট এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার ঘাটতি আছে PR নীতিগতভাবে উপকারী হলেও প্রয়োগ ও ফলাফল ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল হবে।
বিশ্লেষকরা আশংকা করেছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক কনফিগারেশন ও আস্থা না থাকলে PR অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যদি নির্বাচনী পরিবেশে সংলাপ ও আস্থাহীনতা থাকে, PR-কার্যকর হলে ছোট দলগুলো সহজে জোট করে অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। তারা মনে করেন রাজনৈতিক উত্তেজনা সময়েই বড় পরিবর্তন ঢুকালে তা দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে; সুদীর্ঘ স্থিতিশীলতার বদলে স্বল্পমেয়াদি সংকট গড়ে উঠতে পারে। থ্রেশহোল্ড, অনলাইন/জাতীয় তালিকা, মিক্সড-ফর্ম এসব নির্ধারণ করলে কোন দল লাভবান হবে এই প্রশ্নে বড় দলগুলো ব্যাপকভাবে লেনদেন করবে। এজন্য সম্মতিপূর্ণ নকশা তৈরি কঠিন। (তথ্য সূত্র : tbsnews, the diplomat, প্রথম আলো )
সিনিয়র সাংবাদিক/ কলাম লেখক