রিয়াজুল হক:
'প্রত্যেক জীবকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে', পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি (সূরা আল ইমরান, আয়াত ১৮৫) কেবল ধর্মীয় কোনো বাণী নয়, বরং এক চরম বাস্তবতাও। আমরা পৃথিবীর জীবনকে এতটাই আকড়ে ধরেছি যে, মৃত্যুকে ভুলে থাকার নাম করে জীবনের মূল উদ্দেশ্যকে হারিয়ে ফেলছি। অথচ মৃত্যু অনিবার্য, নির্ধারিত এবং অপ্রতিরোধ্য। ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা, প্রভাবশালী-নামহীন কারো রেহাই নেই।
আজকের এই অনিশ্চিত সময়ে, যখন মৃত্যু এতটাই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, কখনো রাস্তায়, কখনো হাসপাতালের বারান্দায়, আবার কখনোই নিঃশব্দে ঘরে বসে হানা দেয়, তখন নতুন করে মনে পড়ে, আমরা সকলেই ক্ষণস্থায়ী।
করোনাভাইরাস মহামারি, যুদ্ধ, রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনা, অথবা হঠাৎ কোনো অসুখ ইত্যাদি প্রতিটি ঘটনাই যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন কতোটা অনিশ্চিত আর মৃত্যু কতোটা নিকটবর্তী!
তবুও কি আমরা মৃত্যু নিয়ে ভাবি? খুব কমই। আমরা ভাবি কিভাবে আরও অর্থ উপার্জন করা যায়, কীভাবে সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো যায়, কোথায় ভালো ছুটি কাটানো যায়। অথচ কেউ ভাবে না, এই জীবন হঠাৎ থেমে গেলে কী থেকে যাবে পেছনে? হয়ত কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, কিছু জমি-জায়গা, যা ভোগ করবে অন্য কিছু মানুষ আর কিছু আত্মীয়দের কয়েকদিনের চোখের পানি।
মৃত্যুর চেতনা আমাদের জীবনের গতি পাল্টাতে পারে। যদি আমরা প্রতিদিন কিছু সময় নেই মৃত্যুর কথা ভাবতে, তবে জীবনটা কেমন হতো? হয়তো তখন আমরা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে রাগ করতাম না, হয়তো হিংসা ও প্রতিশোধের আগুনে নিজেকে পোড়াতাম না, হয়তো ক্ষমা করা শিখে ফেলতাম। মৃত্যু আমাদের শেখায় বিনয়, স্মরণ করিয়ে দেয়, আমরা কেউই অপরিহার্য নই, কেউই অমর নই।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকাল কাছের মানুষগুলোর মৃত্যুর খবরও যেন আমাদের তেমনভাবে নাড়া দেয় না। আর অপরিচিতদের মৃত্যু তো এক সেকেন্ডের জন্যও মাথায় প্রবেশ করে না। খবরের কাগজে একসাথে পাঁচ-দশজনের মৃত্যুর খবর ছাপা হয়। সামাজিক মাধ্যমে আমরা দেখি শোকবার্তা, তারপরই আঙ্গুল দিয়ে ব্যস্ততার সাথে স্ক্রল করে নিচে চলে যাই। মৃত্যু যেন এক রকম সংখ্যার খেলা হয়ে উঠেছে, যেমন “আরও একজন চলে গেলেন”, “আজ এতজন নিহত”, “তাঁর মৃত্যুতে আমরা শোকাহত”, কেমন যেন যান্ত্রিক, অনুভূতিহীন। যেন মনে হয়, মৃত্যু অন্যের জন্য, আমার জন্য নয়।
কিন্তু মৃত্যু কেবল একটি ঘটনা নয়, এটি একটি গভীর উপলব্ধি। যারা মৃত্যুর কথা স্মরণ করে জীবন কাটায়, তারা সাধারণত অহংকারী হয় না, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, সময়ের কদর করে এবং প্রতিটি দিনকে অর্থবহ করে তোলে।এককথায়, মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে আত্মশুদ্ধির দিকে টানে।
এই প্রজন্মের জন্য বিশেষ করে মৃত্যুচিন্তা গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির উন্নয়নে আমরা যেন অনন্ত জীবনের এক ভ্রান্ত ধারণায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি। সোশ্যাল মিডিয়াতে ‘চিরস্মরণীয়’, ‘অমর’, এসব শব্দ আমরা অনেকেই হালকাভাবে ব্যবহার করি।
মূলত মৃত্যু ভয় পাওয়ার জন্য নয়, প্রস্তুত হওয়ার জন্য। মৃত্যুভয় এক ধরনের আত্মশুদ্ধির পথচিহ্ন। যদি কেউ জানে যে সে মারা যাবে, তবে সে চায় না অন্যকে কষ্ট দিতে, সে চায় ভালো কাজ করতে, সম্পর্ক গড়ে তুলতে, ভুলত্রুটি শুধরে নিতে। মৃত্যু আমাদের জন্য এক প্রেরণা হতে পারে, যদি আমরা সঠিকভাবে তাকে উপলব্ধি করতে পারি।
আমাদের এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের মূল্য বোঝা উচিত। মৃত্যুর কথা স্মরণ করে বর্তমানকে সুন্দর করা উচিত। প্রতিদিন কিছু ভালো কাজ করা উচিত, যেন মৃত্যুর পরে কেউ অন্তত মনে করে, 'এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি অন্যের জন্য বাঁচতেন।' কিংবা 'অমুক লোকটা ভালো মানুষ ছিলেন।'
লেখকঃ রিয়াজুল হক, যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক