আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি: ইসরায়েল সরকার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মিজোরাম ও মণিপুরে বসবাসকারী ‘বনে মেনাশে’ ইহুদি সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট ৫,৮০০ সদস্যকে ইসরায়েলে প্রত্যাবাসনের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে। ইসরায়েলি সরকার প্রাথমিকভাবে এই সম্প্রদায়কে নোফ হাগালিল এবং লেবানন সীমান্তবর্তী উত্তরাঞ্চলীয় গালীল অঞ্চলের অন্যান্য শহরে পুনর্বাসিত করার লক্ষ্য নিয়েছে।
ইসরায়েল এই পদক্ষেপকে অনুন্নত ও জনবিরল অঞ্চলে ইহুদি জনসংখ্যা বৃদ্ধির এবং সংঘাত-বিধ্বস্ত এলাকায় জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে দেখছে। এই পদক্ষেপের প্রধান লক্ষ্য হলো ধর্মীয় প্রত্যাবাসন, যা শুধু গালীলকে ‘ইহুদিকরণ’ করবে না, বরং উল্লেখযোগ্য আরব জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই অঞ্চলে সীমান্তকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তাকেও মজবুত করবে।
লেবাননের হেজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতের কারণে এই অঞ্চলটি গুরুতরভাবে প্রভাবিত হয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাজার হাজার বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই সিদ্ধান্তকে ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং জায়োনিস্ট সিদ্ধান্ত যা উত্তর এবং গালীল অঞ্চলকে শক্তিশালী করবে’ বলে অভিহিত করেছেন, যা দ্য টাইমস অব ইসরায়েল প্রকাশ করেছে। এই সম্প্রদায়ের প্রায় ১,২০০ সদস্য ২০২৬ সালের শেষের মধ্যে ইসরায়েলে পৌঁছাবেন এবং বাকিরা দ্বিতীয় ধাপে ২০৩০ সালের মধ্যে আসবেন।
বনে মেনাশে সম্প্রদায় নিজেদের ইসরায়েলের ১০টি বিলুপ্ত উপজাতির অন্যতম বলে দাবি করে এবং তাদের পূর্বপুরুষরা খ্রিস্টপূর্ব ৭২২ সালে ইসরায়েল রাজ্য পরাজিত হওয়ার পর নির্বাসিত হয়েছেন। আইআইটি-দিল্লির সমাজতত্ত্ব গবেষক বনলালহমাঙ্গাইহা, যাঁর ইহুদি নাম আসাফ রেনথলেই, বলেন, “বনে মেনাশে দাবি করে যে খ্রিস্টপূর্ব ৭২২ সালে ইসরায়েল রাজ্যের পরাজয়ের পর তারা পূর্ব দিকে মধ্য এশিয়া ও চীন পেরিয়ে ভারত-মায়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘বনে’ মানে ‘সন্তান’ এবং ‘মেনাশে’ হলো জ্যাকবের নাতির নাম, যাঁকে ইসরায়েলি জনগণের ঐতিহ্যবাহী পূর্বপুরুষ হিসেবে মনে করা হয়।
১৯৫০ সালে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট ‘দ্য ল অব রিটার্ন’ পাশ করে, যা সমস্ত অ-ইসরায়েলি ইহুদি এবং ধর্মান্তরিতদের ইসরায়েলে বসতি স্থাপন এবং নাগরিকত্ব লাভের অনুমতি দেয়। গত দুই দশকে পূর্ববর্তী সরকারি সিদ্ধান্তের অধীনে এই সম্প্রদায়ের প্রায় ৪,০০০ সদস্য ইতিমধ্যে ইসরায়েলে অভিবাসন করেছেন।
জেরুজালেম পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, নতুন অভিবাসীরা চিফ রাব্বিনেটের মাধ্যমে অর্থোডক্স ধর্মান্তকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবেন এবং ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির পর গালীল অঞ্চলকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মূলত নোফ হাগালিলে বসতি স্থাপন করবেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে হামাসের আক্রমণের আগেও লেবানন সীমান্তবর্তী সম্প্রদায়গুলি ভালো স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং স্থিতিশীল কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে সংগ্রাম করছিল। উদাহরণস্বরূপ, মেনারা কিবুতজে (ইসরায়েলের কৃষিভিত্তিক বসতি) ভালো সুযোগের সন্ধানে তরুণ পরিবারগুলি চলে যাওয়ায় ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে জনসংখ্যা ১৫% হ্রাস পেয়েছে।
গালীলের নিম্ন অংশে আরব সংখ্যালঘুদের আধিপত্য রয়েছে। রামাত আরবেলের ইহুদিরা গালীলকে ‘ইহুদিকরণ’ করার ধারণার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। বিলহা এরলিচ হার্টেজ সংবাদপত্রকে বলেন, “আমরা অনুভব করি যে আরব সম্প্রদায়ের সমৃদ্ধির তুলনায় ইহুদি সম্প্রদায়ের বিকল্পগুলি সংকুচিত হচ্ছে এবং ব্যয়বহুল হচ্ছে। গালীলে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ নিজেদের সংখ্যালঘুর মতো অনুভব করছেন।”
দুর্বল পরিকাঠামো এবং লেবাননের সঙ্গে সংঘাতের কারণে জর্জরিত একটি অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই পদক্ষেপ সফল হবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত, ভারত থেকে যাওয়া বিলুপ্ত উপজাতি বহু সহস্রাব্দ পরে ‘ঘরে’ ফিরতে প্রস্তুত।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন