এস এম ফয়েজ
‘সাংবাদিকদের শত্রু সাংবাদিকরাই’ এই প্রবাদটি গণমাধ্যম জগতে বহুল প্রচলিত একটি তিক্ত সত্য। এটি কেবল একটি আক্ষেপ নয়, বরং সাংবাদিকতা পেশার অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা, যেখানে আদর্শের লড়াইয়ের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ, দলাদলি এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা মুখ্য হয়ে উঠেছে। যখন সমাজের আয়না হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকরাই নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি করেন, তখন পুরো পেশার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
পেশাগত জীবনে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, যা অনেক সময় অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য তৈরি করে।
তীব্র প্রতিযোগিতা ও পেশাগত ঈর্ষা
আধুনিক সাংবাদিকতা ক্ষেত্রটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। ব্রেকিং নিউজের সংস্কৃতি এবং টিআরপি (ঞজচ)-র দৌড়ে সাংবাদিকরা প্রায়শই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ান। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা অনেক সময় পেশাগত ঈর্ষায় রূপ নেয়। একজন সহকর্মীর সাফল্য বা কোনো বড় অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কৃতিত্ব অন্য সহকর্মীর মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারে। এই মনোভাব থেকে একে অপরের কাজের সমালোচনা করা, তথ্য গোপন করা, এমনকি একে অপরের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলার মতো ঘটনাও ঘটে, যা পেশার সংহতি নষ্ট করে।
মতাদর্শিক বিভাজন ও গ্রুপিং রাজনীতি
বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ রাজনৈতিকভাবে প্রবলভাবে বিভক্ত। সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেস ক্লাব বা অন্যান্য সংগঠনগুলো প্রায়শই রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এর ফলে পেশাগত পরিচয়ের চেয়ে দলীয় আনুগত্য বড় হয়ে ওঠে। একই পেশার মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ভিন্ন মতাদর্শের কারণে একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়ায়। এই গ্রুপিং রাজনীতির শিকার হয়ে অনেক যোগ্য সাংবাদিক মূল ধারা থেকে ছিটকে পড়েন বা কোণঠাসা হয়ে যান।
নৈতিকতার অবক্ষয় ও পারস্পরিক দোষারোপ
কিছু ক্ষেত্রে, দ্রুত সাফল্য বা অর্থনৈতিক লাভের আশায় নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটে। এক সাংবাদিক অন্য সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা, চরিত্রহনন করা বা ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করার মতো হীন কাজে লিপ্ত হন। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই কাদা ছোড়াছুড়ি আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। যখন সাংবাদিকদের মনোযোগ নিজেদের ভেতরের কোন্দলে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন সমাজের প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যায়।
পেশার প্রতি জনআস্থার সংকট
‘সাংবাদিকদের শত্রু সাংবাদিকরাই’ এমন পরিবেশ সাধারণ মানুষের মনে এই পেশার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করে। মানুষ যখন দেখে যে সত্য উদ্ঘাটনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই মিথ্যাচার ও দলাদলিতে ব্যস্ত, তখন পুরো গণমাধ্যম ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়। এটি ঁষঃরসধঃবষু স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় হুমকি।
রাজনৈতিক বিভাজন ও গ্রুপিংয়ের বিষবৃক্ষ
বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো (যেমন: সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেস ক্লাব) বহুলাংশে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে বিভক্ত। এই বিভাজন পেশাগত ঐক্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সাংবাদিকরা নিজেদের মধ্যে ‘অমুক দলের’ বা ‘তমুক মতাদর্শের’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়েন। এর ফলে পেশাগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য মুখ্য হয়ে ওঠে।
যখন কোনো সাংবাদিক সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে চান, তখন তাকে নিজ দলের বা মতাদর্শের লোকদের কাছ থেকেই বাধার সম্মুখীন হতে হয়। ভিন্ন মতাদর্শের সাংবাদিকদের কোণঠাসা করা, তাদের চাকরিচ্যুত করার পেছনে কলকাঠি নাড়া এগুলো ভেতরের শত্রুতাই প্রকাশ করে। এই গ্রুপিং রাজনীতির কারণে অনেক মেধাবী ও সৎ সাংবাদিক তাদের পেশাগত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেন না।
নৈতিকতার অবক্ষয় ও কাদা ছোড়াছুড়ি
‘সাংবাদিকদের শত্রু সাংবাদিকরাই’ প্রবাদের একটি বড় কারণ হলো নৈতিকতার অবক্ষয়। কিছু সাংবাদিক নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বা দ্রুত ক্যারিয়ারে উন্নতি করার জন্য সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনেন। সোশ্যাল মিডিয়া এই কাদা ছোড়াছুড়িকে আরও সহজ করে তুলেছে। যখন সাংবাদিকরা নিজেদের ফেসবুক ওয়ালে বা বিভিন্ন গ্রুপে একে অপরের বিরুদ্ধে মানহানিকর মন্তব্য করেন, তখন সাধারণ মানুষের কাছে পেশাটির ভাবমূর্তি হাস্যকর হয়ে ওঠে। এই ধরনের আচরণ পেশার মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করে।সাংগঠনিক জটিলতা: সাংবাদিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ নির্বাচন বা নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে।
যোগাযোগের মাধ্যম: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার সময় ভুল বোঝাবুঝি বা ব্যক্তিগত আক্রমণ হতে পারে।
‘সাংবাদিকদের শত্রু সাংবাদিকরাই’এই কলঙ্কিত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে পেশাদারিত্ব এবং নৈতিকতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সুস্থ প্রতিযোগিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং পেশাগত স্বার্থকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে দলাদলি মুক্ত হয়ে সাংবাদিকদের প্রকৃত কল্যাণে কাজ করতে হবে। একমাত্র পেশাগত সংহতি এবং নৈতিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনলেই এই প্রবাদটি মিথ্যা প্রমাণ করা সম্ভব।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
রিপোর্টার্স২৪/এসসি