রিয়াজুল হক
বিশ্ব অর্থনীতিতে শুল্ক আরোপ, নিষেধাজ্ঞা অর্থাৎ বাণিজ্য যুদ্ধ নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে দেখা যায়, রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক শুল্ক আরোপ ও পাল্টা প্রতিশোধমূলক সিদ্ধান্ত বহুবার অর্থনৈতিক অস্থিরতা ডেকে এনেছে। উনিশ শতকের শেষভাগে ইতালি ও ফ্রান্সের মধ্যে সংঘটিত বাণিজ্য যুদ্ধ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সদ্য একীভূত ইতালি নিজেদের শিল্প সুরক্ষার লক্ষ্যে ফ্রান্সের পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিল। জবাবে শক্তিশালী ফ্রান্স ইতালির রপ্তানির ওপর কঠোর শুল্ক বসায়। ফলাফল ছিল অনুমেয়, ইতালির রপ্তানি কার্যত ভেঙে পড়ে। পরে ইতালি নিজেদের ভুল বুঝে শুল্ক প্রত্যাহার করলেও ফ্রান্স বহু বছর শাস্তিস্বরূপ অতিরিক্ত শুল্ক বহাল রাখে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে— বাণিজ্য যুদ্ধে আদৌ কি কেউ লাভবান হয়?
বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ তার অন্যতম উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ তোলে, চীন অন্যায্য ভর্তুকি, প্রযুক্তি চুরি ও বাণিজ্য ঘাটতির মাধ্যমে নিজেদের শিল্পকে এগিয়ে নিচ্ছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ায়। ফলাফল কী হলো?
প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, দুটি দেশই নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের জন্য ইলেকট্রনিক্স, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি ও শিল্প উপকরণের দাম বেড়ে যায়। মূল্যস্ফীতির চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। চীনের রপ্তানি নির্ভর অনেক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়ে। অর্থাৎ শক্তিধর দুই অর্থনীতিই ক্ষতির মুখোমুখি হয়—কেউই প্রকৃত অর্থে বিজয়ী হয় না।
এছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই বলা হয়, দেশীয় শিল্প রক্ষার স্বার্থে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করা ন্যায্য। যুক্তিটি আংশিকভাবে গ্রহণযোগ্যও বটে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয়, যখন এই শুল্ক আরোপের উদ্দেশ্য হয়, শিল্প সুরক্ষার বদলে প্রতিপক্ষ দেশকে ‘শায়েস্তা করা’। তখন বিষয়টি অর্থনীতির নিয়মে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রূপ নেয় রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসাবে।
এখানে আরেকটি বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না, উচ্চ ট্যারিফ বসালেই দেশীয় শিল্প স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তিশালী হয়ে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। শিল্পের টিকে থাকার জন্য প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের মান, সরবরাহ সক্ষমতা এবং সর্বোপরি ভোক্তার আস্থা ইত্যাদি সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। শুধুমাত্র শুল্কের দেয়াল তুলে দিয়ে এসব ঘাটতি ঢেকে রাখা যায় না।
বাণিজ্য যুদ্ধের একটি তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে পণ্যের দামে। আমদানিকৃত কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হন সাধারণ ভোক্তারা—যারা সংখ্যায় অনেক, কিন্তু বাণিজ্য যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যাদের কোনো ভূমিকা থাকে না। রাষ্ট্রের নীতিগত দ্বন্দ্বের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হয়।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়— এই পরিস্থিতিতে লাভবান হয় কারা?
এখানেই আসে তৃতীয় পক্ষের গল্প। যুক্তরাষ্ট্র যখন চীন থেকে পণ্য আমদানি কমিয়ে দেয়, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করে ভিয়েতনাম, মেক্সিকো, ভারত, এমনকি বাংলাদেশও। চীনের বিকল্প হিসেবে অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা তাদের উৎপাদন ঘাঁটি স্থানান্তর করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ফলে বাণিজ্য যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ না করেও কিছু দেশ নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ পায়।
একই চিত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়ার মধ্যকার নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে ইউরোপে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে ইউরোপকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করতে হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ নতুন জ্বালানি বাজার পেয়ে যায়। আবার ভারত ও চীন তুলনামূলক কম দামে রুশ জ্বালানি কিনে নিজেদের শিল্প খরচ কমানোর সুযোগ পায়। অর্থাৎ সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলো চাপে পড়লেও তৃতীয় পক্ষের জন্য সুযোগ তৈরি হয়।
এক কথায় বললে, বাণিজ্য যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো সাধারণত কেউই জেতে না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র–চীন, ইউরোপ–রাশিয়া কিংবা অতীতের ইউরোপীয় বাণিজ্য সংঘাত, সব ক্ষেত্রেই ক্ষতির পাল্লা ভারী হয়েছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রয়েছে—যারা এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না, তারাই সক্ষমতা থাকলে সুযোগটি কাজে লাগাতে পারে। অর্থাৎ, যুদ্ধের বাইরে থাকা দেশটি মুনাফা অর্জন করে হয়ে উঠে নীরব বিজয়ী।
এই বাস্তবতা বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বাণিজ্য যুদ্ধের সময় যারা কৌশলগতভাবে নিরপেক্ষ থাকতে পারে, বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পারে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয়। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এটি একটি বড় সুযোগও বটে। বৈশ্বিক বাজারে যখন বড় শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়ায়, তখন বিকল্প উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে নতুন দেশগুলোর সামনে দরজা খুলে যায়।
অতএব, বাণিজ্য যুদ্ধকে শুধুই শক্তির লড়াই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে সুযোগ ও সতর্কতার বার্তা। ইতিহাস আমাদের বারবার শিখিয়েছে, এই যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারীরা সাধারণত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর দূরে দাঁড়িয়ে কৌশলগতভাবে সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে তৃতীয় পক্ষই শেষ পর্যন্ত মুনাফা অর্জনের সুযোগ পায়।
লেখক: রিয়াজুল হক, অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।
[ আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল। এই বিভাগে লেখকের মতামত একান্তই তার নিজস্ব; যার দায়ভার রিপোর্টার্স২৪ বহন করে না। ধন্যবাদ]