রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ২০২৫। প্রাপ্তি ও অর্জনের পাশাপাশি এই বছরটি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য রেখে গেল গভীর শূন্যতা ও দীর্ঘশ্বাস। কবিতা, গবেষণা, ভাস্কর্য, প্রগতিশীল চিন্তা ও কিশোর সাহিত্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিভে গেছে উজ্জ্বল কিছু নক্ষত্র। বছরজুড়ে ৭ জন কবি, লেখক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীর প্রয়াণ বাংলা সাহিত্যকে করেছে আরও নিঃস্ব। তাদের স্মরণেই আজকের ফিরে দেখা।
সন্জীদা খাতুন
বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলনের অগ্রদূত ও ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সন্জীদা খাতুন মারা যান ২৫ মার্চ বিকেল ৩টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে। জন্ম ১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল। জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের কন্যা সন্জীদা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বভারতীতে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং পরে পিএইচডি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেছেন। ভাষা, সংগীত ও সংস্কৃতি আন্দোলনে তার অবদান অনস্বীকার্য।
দাউদ হায়দার
নির্বাসিত কবি ও লেখক দাউদ হায়দার ২৬ এপ্রিল রাতে জার্মানির বার্লিনে মৃত্যুবরণ করেন। বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। জন্ম ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, পাবনায়। একসময় দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতার সম্পাদক ছিলেন তিনি। একটি কবিতাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশত্যাগে বাধ্য হন। জার্মান সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাসের উদ্যোগে জার্মানিতে আশ্রয় নেন। নির্বাসনের জীবনেও তিনি বাংলা কবিতার এক ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর হয়ে ছিলেন।
হামিদুজ্জামান খান
বিশিষ্ট ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান ২০ জুলাই সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৬ মার্চ কিশোরগঞ্জে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগে চার দশকের বেশি সময় অধ্যাপনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধপ্রেরণায় নির্মিত ‘একাত্তর স্মরণে’সহ তার অসংখ্য ভাস্কর্য দেশে-বিদেশে স্থাপিত হয়েছে। তিনি একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি ফেলোশিপে ভূষিত ছিলেন।
যতীন সরকার
স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক যতীন সরকার ১৩ আগস্ট ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট নেত্রকোনায়। প্রগতিশীল চিন্তা, বাম রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে আজীবন যুক্ত ছিলেন তিনি। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাহিত্য ও গবেষণায় তার অবদান বাংলা মননের ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে থাকবে।
বদরুদ্দীন উমর
লেখক-গবেষক ও রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর ৭ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। ভাষা আন্দোলন ও পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে তার গবেষণা পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত। তিন খণ্ডের ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থ ইতিহাসচর্চায় মাইলফলক। চলতি বছর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি।
শ্বেতা শতাব্দী এষ
২০২৫ সালের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিদায়—তরুণ কবি শ্বেতা শতাব্দী এষ। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ১২ সেপ্টেম্বর মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জন্ম ১৯৯২ সালে জামালপুরে। জন্মগত বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজরের সঙ্গে লড়াই করেই সাহিত্যচর্চা চালিয়ে গেছেন। ‘অনুসূর্যের গান’, ‘রোদের পথে ফেরা’, ‘হাওয়া ও হেমন্ত’সহ একাধিক কাব্যগ্রন্থে তিনি রেখে গেছেন গভীর সংবেদনশীলতার স্বাক্ষর।
রকিব হাসান
কিশোর সাহিত্যকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নেওয়া লেখক রকিব হাসান ১৫ অক্টোবর ডায়ালাইসিস চলাকালীন মারা যান। জন্ম ১৯৫০ সালের ১২ ডিসেম্বর। ‘তিন গোয়েন্দা’ সিরিজের স্রষ্টা হিসেবে তিনি কয়েক প্রজন্মের কিশোরদের কল্পনাজগৎ গড়ে দিয়েছেন। শুধু এই সিরিজেই লিখেছেন ১৬০টি বই। অনুবাদ ও সম্পাদনার মাধ্যমেও তিনি বাংলা কিশোর সাহিত্যে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন।
প্রস্থান হলেও রয়ে গেলেন সৃষ্টিতে
২০২৫ সাল চলে যাচ্ছে, রেখে যাচ্ছে শূন্যতা। তবে এই মানুষগুলো তাদের লেখনী, গবেষণা, ভাস্কর্য ও চিন্তার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবেন পাঠকের হৃদয়ে, সংস্কৃতির ধারায়, ইতিহাসের পাতায়।
রিপোর্টার্স২৪/আয়েশা