শাহানুজ্জামান টিটু
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে একটি বড় ধরনের প্যারাডাইম শিফট বা আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি স্পষ্ট যে, দিল্লি এখন বিএনপির প্রতি আস্থা রাখতে চাইছে। বিএনপি চেয়ারপারসন সদ্য প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তার দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি শোকবার্তা নিয়ে ঢাকায় আসেন। ওই বার্তাটি শুধু একটি শোকবার্তা ছিল না। এটা ছিল ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত কেমন সম্পর্ক চায়, তার একটি স্পষ্ট বার্তা। জয়শঙ্কর এই বার্তাটি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন। ফলে এটা এখন স্পষ্ট, ভারতের দুজন কূটনীতিক জামায়াতের আমির ডা. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যে গোপন বৈঠকটি করেছিলেন, তা থেকে ভারত তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে। নির্বাচনের আগে ভারতের অবস্থান প্রকাশ এবং রয়টার্সের সঙ্গে গোপন বৈঠকের বিষয়ে জামায়াত আমিরের স্বীকারোক্তি—এসব বিষয়ে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটা কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নয়; বরং এটি একটি ‘পলিটিক্যাল রিভেঞ্জ’ বা রাজনৈতিক প্রতিশোধ হতে পারে। রয়টার্সের মাধ্যমে তথ্যটি নিশ্চিত হওয়া এবং ভারতের অনুরোধের কথা প্রকাশ করে দেওয়া—এগুলো মূলত দিল্লির দ্বিমুখী নীতির মুখোশ উন্মোচন করার একটি চেষ্টা করেছে জামায়াত আমির।
১. ভারতের কৌশলগত শিফট: জামায়াত থেকে বিএনপি?
তারেক রহমানকে দেওয়া নরেন্দ্র মোদীর শোকবার্তার মাধ্যমে ভারত একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় শেখ হাসিনা সরকারের ওপর বাজি ধরার পর, ভারত এখন বাংলাদেশে একটি ‘স্টেবল’ বা স্থিতিশীল অংশীদার খুঁজছে।
ভারত উপলব্ধি করছে যে, বাংলাদেশের বর্তমান জনমতে বিএনপি এককভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের ঢল দিল্লির কাছে প্রমাণ করেছে যে, বিএনপিই ভবিষ্যৎ ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, জামায়াতের সঙ্গে ভারতের গোপন বৈঠকটি হয়তো ছিল একটি ‘পরীক্ষামূলক যোগাযোগ’ (Testing the waters)। কিন্তু সম্ভবত ভারত জামায়াতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের চেয়ে বিএনপির সঙ্গে ‘নতুন অংশীদারিত্ব’ গড়াকেই বেশি নিরাপদ ও লাভজনক মনে করছে।
২. জামায়াত আমিরের সত্য প্রকাশ: সততা নাকি রাজনৈতিক হতাশা?
জামায়াত আমির যে চার মাস পর বৈঠকের কথা স্বীকার করলেন, একে অনেকেই ‘কৌশলগত পরাজয়’ হিসেবে দেখছেন। হতে পারে ভারত জামায়াতকে যে ধরনের নিশ্চয়তা বা সমর্থন দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল, তা তারা রক্ষা করেনি। মোদীর বার্তায় বিএনপির প্রতি ঝোঁক দেখে জামায়াত আমির হয়তো বুঝতে পেরেছেন যে, দিল্লি তাদের কেবল ‘বিকল্প’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এই হতাশা থেকেই তিনি সত্যটি ফাঁস করে ভারতকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলার চেষ্টা করে থাকতে পারেন।
৩. বিএনপির গণজোয়ার ও জামায়াতের ‘অস্তিত্বের ভয়’
বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় যে জনসমুদ্র দেখা গেছে এবং তারেক রহমানকে নিয়ে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তা জামায়াতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। জামায়াত বুঝতে পারছে যে, আওয়ামী লীগ-পরবর্তী রাজনীতিতে তারা বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চেয়েছিল। কিন্তু বিএনপির এই অভূতপূর্ব গণজোয়ার প্রমাণ করে যে, বিএনপি এককভাবেই রাজপথ ও জনমত দখলে সক্ষম।
বিএনপির প্রতি ভারতের আস্থায় জামায়াত রাজনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। এই ভীতি থেকেই হয়তো জামায়াত আমির ভারতের গোপনীয়তার অনুরোধ ভঙ্গ করে নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করেছেন।
এই পুরো বিষয়টি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন ভারতের ভূমিকা নিয়ে একটি নতুন ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে, যেখানে জামায়াত নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। দিল্লি সম্ভবত জামায়াতকে চাপ দিয়ে বিএনপিকে বাগে আনতে চেয়েছিল, কিন্তু জামায়াত সেই গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়ে দিল্লির কৌশলে জল ঢেলে দিয়েছে।
রাজনীতির ময়দানে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তবে জনগণের আস্থা হারানোই কি এখন জামায়াতের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি? আপনার কী মনে হয়? ভারত কি আসলেই জামায়াতকে ছেড়ে বিএনপির দিকে ঝুঁকছে? আপনার মতামত আমাদের কমেন্ট বক্সে জানান।
সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ;ইমেইল: [email protected]
[ আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল। এই বিভাগে লেখকের ‘মতামত’ একান্তই তার নিজস্ব; যার দায়ভার রিপোর্টার্স২৪ বহন করে না। ধন্যবাদ]