আন্তর্জাতিক ডেস্ক: তাইওয়ানকে ঘিরে গত সপ্তাহে চীনের চালানো ব্যাপক যুদ্ধ মহড়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্বীপটির প্রতি ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক সমর্থনকে দুর্বল করা এবং একই সঙ্গে চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া এমনটাই জানিয়েছে তাইওয়ানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থা।
বুধবার সংসদে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে তাইওয়ানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি ব্যুরো (এনএসবি) জানায়, ‘জাস্টিস মিশন ২০২৫’ নামের এই সামরিক মহড়ায় চীন তাইওয়ানের দিকে ডজনখানেক রকেট নিক্ষেপ করে এবং দ্বীপটির আশপাশে বিপুলসংখ্যক যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে।
এই সামরিক তৎপরতার কারণে তাইওয়ানের ভেতরে বেশ কয়েক ডজন অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করতে হয়। একই সঙ্গে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল ও পশ্চিমা দেশগুলোর মিত্রদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা প্রতিবেদনে বলা হয়,তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে পরিচালিত এই সামরিক মহড়ার স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল িআন্তর্জাতিক অঙ্গনে গণতান্ত্রিক অংশীদারদের তাইওয়ানপন্থী অবস্থানের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী,এটি ছিল চীনের ইতিহাসে ভৌগোলিক বিস্তারের দিক থেকে সবচেয়ে বড় সামরিক মহড়া। একই সঙ্গে এই পদক্ষেপের মাধ্যমে চীন নিজেদের দেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও সামাজিক অস্থিরতা থেকে জনগণের ক্ষোভ ঘুরিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে, যা ‘বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তাইওয়ানের নিরাপত্তা সংস্থা বলছে, চীন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি তথাকথিত ‘হাইব্রিড’ কৌশল ব্যবহার করছে যার মধ্যে রয়েছে তথ্যযুদ্ধ, সাইবার হামলা ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ। এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলো ক্রমেই বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
প্রতিবেদনে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির একটি মন্তব্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছর তিনি বলেছিলেন, গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ানের ওপর চীনের হামলা জাপানের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাইওয়ানের মতে, এই মন্তব্য প্রমাণ করে যে তাইওয়ান প্রণালীর নিরাপত্তা এখন সরাসরি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া
তাইওয়ানের প্রতিবেদনের বিষয়ে চীনের তাইওয়ানবিষয়ক দপ্তর মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তবে বুধবার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে দপ্তরটি জানায়, তাইওয়ানের আশপাশে সাম্প্রতিক সামরিক মহড়ার উদ্দেশ্য ছিল ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা’।
চীনের দাবি,এই মহড়াগুলো প্রণালীর দুই পাশের চীনা জনগণের অভিন্ন স্বার্থ এবং পুরো চীনা জাতির মৌলিক স্বার্থ রক্ষার জন্যই পরিচালিত হয়েছে।
তথ্যযুদ্ধ ও সাইবার হামলার অভিযোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক মহড়ার সময় চীন রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কনটেন্ট এবং অনলাইন ‘ট্রল বাহিনী’ ব্যবহার করে ব্যাপক তথ্যযুদ্ধ চালিয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল,তাইওয়ানের সেনাবাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি,প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা দুর্বল করা।
মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে ৭৯৯টি অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ১৯ হাজার ‘বিতর্কিত বার্তা’ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া মহড়ার প্রথম দুই দিনে তাইওয়ানের সরকারি নেটওয়ার্কে ২০ লাখের বেশি সাইবার হামলা চালানো হয়। এসব হামলায় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাকার গ্রুপ এপিটি২৪ (APT24) ও ব্ল্যাকটেক (BlackTech) সক্রিয় ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
তাইওয়ানের নিরাপত্তা সংস্থার ভাষ্য,চীন সামরিক মহড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে সাইবার হামলা চালাচ্ছে, যাতে তাইওয়ানের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং জনগণের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে। চীন অবশ্য নিয়মিতভাবেই সাইবার হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
তাইওয়ান প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থান
চীন তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি। অন্যদিকে তাইপে স্পষ্টভাবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলছে তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র তাইওয়ানের জনগণেরই।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি