আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি :
আসামের গোলাঘাট জেলার এক পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলাকে পুলিশ কর্তৃক আটক করে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভুল শনাক্ত হওয়ার পর অবশেষে ওই নারীকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
৫০ বছর বয়সী রহিমা বেগমকে গত সপ্তাহে নিরাপত্তা বাহিনী তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সীমান্ত অতিক্রম করে ফিরে না আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে জানা যায়, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের নথিপত্রে একটি রেজিস্ট্রেশন নম্বর ভুল থাকার কারণেই তাকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই ভুল সংশোধনের পর বেগমকে পুনরায় বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়।
ঘটনার বিস্তারিত অনুযায়ী, ২৫ মে ভোর ৪টার দিকে পুলিশ গোলাঘাট জেলার ২ নম্বর পদুমনি গ্রামে রহিমা বেগমের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে তাকে থানায় যেতে বলে। সারা সকাল থানায় কাটানোর পর, তাকে জেলা পুলিশ সুপারের দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আঙুলের ছাপ নেওয়া হয় এবং সন্ধ্যায় আরও কয়েকজনের সঙ্গে তাকে একটি গাড়িতে করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। বেগমের কথায়, তিনি জানতেন না গন্তব্য কোথায়।
তার স্বামী মালেক আলি বলেন, ‘আমাদের দুই মেয়ে দেখেছে, রাতের বেলায় তাদের মাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর চার দিন ধরে আমাদের জানানো হয়নি তিনি কোথায় ছিলেন।’ মালেক জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতে তাদের একটি দল বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে যায় এবং ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী তাদের হাতে কিছু বাংলাদেশি মুদ্রা দেয়, সীমান্ত পার হয়ে যেতে বলে।
রহিমা বেগম বলেন, ‘আমরা ধানক্ষেত, কাদায় ভরা মাঠ আর হাঁটু সমান জলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে এক গ্রামে পৌঁছাই। সেখানকার লোকজন আমাদের তাড়া করে, এবং বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আমাদের আটক করে প্রচণ্ড মারধর করে। পরে তারা আমাদের ফিরে যেতে বলে।’
তারা সারাদিন ধানক্ষেতে অবস্থান করে এবং পানের জন্য ধানক্ষেতের পানি ব্যবহার করেন। পরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভারতীয় বাহিনী তাদের ডেকে নেয়, মুদ্রা উদ্ধার করে এবং বেগমকে কোকরাঝাড় হয়ে গোলাঘাটে ফিরিয়ে আনা হয়।
এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গোলাঘাটের পুলিশ সুপার রাজেন সিং এবং বিএসএফ গুয়াহাটি ফ্রন্টিয়ারের কর্মকর্তারা ফোন বা বার্তার জবাব দেননি।
বেগমের আইনি প্রতিনিধি লিপিকা দেব জানান, রহিমা বেগমের পরিবার ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগেই ভারতে এসেছিল বলে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল নিশ্চিত করেছে। ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী, বেগম ‘পোস্ট-স্ট্রিম’ ক্যাটেগরিতে পড়েন, যার অর্থ হলো তিনি ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য, যদিও ১০ বছর পর্যন্ত ভোটাধিকার স্থগিত ছিল।
দেব আরও জানান, এফআরআরও অফিসে রেজিস্ট্রেশন নম্বরের একটি অঙ্কে বিভ্রান্তির কারণে এই ভুল তৈরি হয়। ‘আমরা নম্বরের অমিল শনাক্ত করে তা পুলিশ সুপারের কাছে তুলে ধরি। প্রশাসনের উচিত ছিল এই তথ্য যাচাই করতে রেজিস্ট্রেশন অফিসে ফোন করা। তার আগে এমন পদক্ষেপে যাওয়া খুবই দায়িত্বজ্ঞানহীন।’
এই ঘটনায় রাজ্য সরকারের বিদেশি নাগরিক সনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার নির্ভুলতা এবং মানবিক দৃষ্টিকোণের অভাব নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আগেই জানিয়েছেন, বিদেশি ঘোষিত ব্যক্তিদের সীমান্ত পার করিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী চলছে।
কিন্তু রহিমা বেগমের ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ভুল শনাক্তকরণ কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। দুই বছরের আইনি লড়াই শেষে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বৈধ ঘোষণা পাওয়ার পরও এক মহিলাকে সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়ার এই ঘটনা আসামে নাগরিকত্ব নির্ধারণ প্রক্রিয়ার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব