রিয়াজুল হক
বিশ্বের পবিত্রতম পানির উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে মক্কাস্থ জমজম কূপ। ইসলাম ধর্মে এই পানিকে বরকতময়, রোগ নিরাময়কারী এবং অলৌকিক গুণসম্পন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এই কূপের পানি শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণেও বিস্ময় জাগিয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পানি সরবরাহ করে চলেছে জমজম কূপ। সেটা এমন একটি মরুভূমি অঞ্চলে, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে এত বিশুদ্ধ ও জীবাণুমুক্ত পানির উৎস পাওয়া যায়না।
জমজম কূপ মক্কার মসজিদুল হারামের কাছে অবস্থিত। কূপটির গভীরতা প্রায় ৩০ মিটার (প্রায় ৯৮ ফুট) এবং এটি একটি গ্রানাইট শিলার স্তরের ওপর নির্মিত। গবেষণা অনুযায়ী, কূপটির চারপাশের ভূগর্ভস্থ স্তর পানির চলাচলের জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক ফিল্টারের মতো কাজ করে, যা জমজম পানিকে প্রাকৃতিকভাবেই পরিশোধিত রাখে।
জমজম কূপের পানি নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহু গবেষণা করেছেন। এতে অনেক বিষ্ময়কর বিষয় উঠে এসেছে। জমজম পানিতে রয়েছে বিভিন্ন খনিজ উপাদান, যেমন: ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, বাইকার্বোনেট, ক্লোরাইড, ফ্লোরাইড, সালফেট। এই উপাদানগুলো শরীরের জন্য উপকারী। উদাহরণস্বরূপ, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম হাড়ের গঠনে সহায়ক এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে।
জমজম পানির পিএইচ প্রায় ৭.৯-৮.০ এর মধ্যে, অর্থাৎ এটি স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য ক্ষারীয়। এই ক্ষারীয়তা মানবদেহে অম্ল-ক্ষার ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।
জমজম পানি নিয়ে বিস্ময়ের একটি দিক হলো এর দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণক্ষমতা। সাধারণত অন্যান্য খনিজ পানি এক বা দুই মাস পর স্বাদ ও রং পরিবর্তন করে, কিন্তু জমজম পানি দীর্ঘদিন রাখলেও তাতে দুর্গন্ধ বা অস্বচ্ছতা দেখা যায় না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পানিতে খনিজ উপাদানের সুনির্দিষ্ট ভারসাম্য ও ব্যাকটেরিয়ার অনুপস্থিতি একে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে।
একাধিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, জমজম পানিতে কোনো ধরনের ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু পাওয়া যায় না। সাধারণত, প্রাকৃতিক কূপের পানিতে কিছু না কিছু মাইক্রোবায়োলজিক উপাদান থাকে, কিন্তু জমজমের পানিতে তা দেখা যায় না। ১৯৭১ সালে কিং সাউদ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম এবং পরে ড. নোটিংহাম (ইউকে) এর গবেষক ড. অ্যাব্দুল সালাম গবেষণা করে দেখান, জমজম কূপের পানিতে কোনো দূষণ বা রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া নেই।
হজ মৌসুমে প্রতিদিন লাখো মানুষ জমজমের পানি গ্রহণ করেন, অনেকে সাথে করে নিয়ে যান। তা সত্ত্বেও কূপটি কখনো শুকায় না। উপরেই উল্লেখ করা হয়েছে, জমজম কূপের গভীরতা মাত্র ৯৮ ফুট। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, জমজম কূপ এক বিরাট ভূগর্ভস্থ জলাধারের সঙ্গে সংযুক্ত, যা আশপাশের শিলা ও পাথরের স্তর থেকে ক্রমাগত পানি গ্রহণ করে থাকে। এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনা জমজমকে টেকসই একটি পানির উৎসে পরিণত করেছে। ‘কিং আব্দুল্লাহ জমজম ওয়াটার ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার’ প্রতিদিন কয়েক লাখ লিটার জমজম পানি পরিশোধন, সংরক্ষণ এবং বিতরণ করছে। স্বয়ংক্রিয় ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও আলট্রা-ভায়োলেট রে ব্যবহার করে পানির বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা হয়। বিজ্ঞান বলছে, জমজমের পানি সত্যিই ব্যতিক্রম। হাজার হাজার বছরের পুরনো এই কূপ এখনো বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করে চলেছে, যা আধুনিক প্রযুক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষায়ও উৎরে গেছে।বিশুদ্ধতায় কোন হের-ফের নেই।
লেখক: অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।
[ আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল। এই বিভাগে লেখকের মতামত একান্তই তার নিজস্ব; যার দায়ভার রিপোর্টার্স২৪ বহন করে না। ধন্যবাদ]