আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কায় নীরবে নিজেদের সামরিক বাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রেখেছিল ডেনমার্ক। প্রয়োজনে জীবিত গোলাবারুদ ব্যবহার করে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশও দেওয়া হয় সেনাদের।
ডেনিশ পাবলিক ব্রডকাস্টার ডিআর-এর খবরে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ সামরিক নেতৃত্ব থেকেই এই নির্দেশ জারি করা হয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব কতটা গভীরভাবে দেখা হচ্ছিল, তা থেকেই এই সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটে। তবে সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে উত্তেজনা কমে আসে।
যদিও ডেনমার্ক সরকার কিংবা বিরোধী দলগুলোর কেউই বাস্তবে হামলার সম্ভাবনাকে খুব বেশি মনে করেননি, তবুও ‘সবচেয়ে চরম সম্ভাব্য পরিস্থিতি’র জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়। গ্রিনল্যান্ড রক্ষার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য ছিল বলে জানিয়েছে ডিআর।
২১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা নাকচ করলে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত হয়।
বহু পৃষ্ঠার লিখিত ওই নির্দেশে ডেনিশ সশস্ত্র বাহিনীকে গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। নির্দেশ জারির পরপরই ডেনমার্ক থেকে গ্রিনল্যান্ডে সেনা ও সরঞ্জাম বহনের জন্য বেসামরিক ও সামরিক উড়োজাহাজ চলাচল করতে দেখা যায়।
রাজনৈতিক ও সামরিক সূত্রের বরাতে ডিআর জানিয়েছে, পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা নিশ্চিত করতেই এই তৎপরতা নেওয়া হয়।
এই সেনা মোতায়েন ‘আর্কটিক এন্ডিউরেন্স’ নামের বহুপদক্ষেপের একটি সামরিক অভিযানের অংশ, যা এখনো চলমান। প্রয়োজনে অতিরিক্ত সেনা ও সক্ষমতা যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি।
নির্দেশে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ডেনিশ সেনারা লাইভ কিউপি (KUP) গোলাবারুদ নিয়ে মোতায়েন রয়েছেন, যাতে প্রয়োজন পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়।
যদিও এই অভিযান আগেই পরিকল্পিত ছিল, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে তা নির্ধারিত সময়ের আগেই শুরু করা হয়। তবে ঠিক কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সিদ্ধান্ত, তা স্পষ্ট নয়।
নির্দেশ জারির পর থেকেই আর্কটিক এন্ডিউরেন্স অভিযান ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে। ডেনিশ সেনাবাহিনীর ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যক’ ইউনিট বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে অবস্থান করছে যার মধ্যে রয়েছে সাঁজোয়া পদাতিক বাহিনী ও বিশেষজ্ঞ ইউনিট।
গ্রিনল্যান্ড সংলগ্ন জলসীমায় নৌ টহল জোরদার করা হয়েছে এবং উত্তর আটলান্টিকের বরফমুক্ত এলাকায় একটি ফ্রিগেট মোতায়েন রয়েছে। বিমান বাহিনী সেনা ও সরঞ্জাম পরিবহন করেছে এবং প্রথমবারের মতো গ্রিনল্যান্ডের আকাশে টহল দিয়েছে ডেনমার্কের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান।
এই অভিযানে ইউরোপের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সেনারাও অংশ নিচ্ছে—এর মধ্যে রয়েছে সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য।
ডিআর-কে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক মহলে এ বিষয়ে ঐকমত্য ছিল যে, যদি হামলা হয়, তবে গ্রিনল্যান্ডকে অবশ্যই রক্ষা করা হবে। ডেনমার্ক যে সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পেরে উঠবে এমন বিশ্বাস থেকে নয়, বরং প্রস্তুতির বার্তা দেওয়া এবং সম্ভাব্য সংঘাতের রাজনৈতিক মূল্য বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই অবস্থান।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সপ্তাহের শুরুতে বলেন,দুর্ভাগ্যজনকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করেননি। তাই আমাদের পক্ষ থেকেও তা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
ডাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF)-এ ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে “আমাদের ভূখণ্ড” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড চায়, তবে তা দখলের জন্য শক্তি প্রয়োগ করবে না।
তবে পরের মুহূর্তেই তিনি বলেন,আপনারা যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন, আমরা কৃতজ্ঞ থাকব। আর যদি ‘না’ বলেন, আমরা তা মনে রাখব।এই মন্তব্য নতুন করে কূটনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
রিপোটার্স ২৪/এসসি