কালাম আজাদ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যত দেশেই তাদের অভিযান পরিচালনা করেছে, সব দেশেই প্রাকৃতিক সম্পদের স্বার্থ ছিল। সর্বশেষ গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপের ৮ দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। গ্রিনল্যান্ডও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর যেসব নীতি নিয়েছেন, সেগুলোর অধিকাংশই পৃথিবীর অন্যান্য দেশের স্বার্থবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্রে যখন নারী কেলেঙ্কারির আলোচনা তুঙ্গে, তখন ‘বহির্বিশ্বের চোখ অন্য দিকে ঘোরাতে’ তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেলেন। এবং এর কিছুদিন পরই নিজেকে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করলেন। আরও ঘোষণা দিলেন,এখন থেকে ভেনেজুয়েলার তেল দেশটির সঙ্গে যৌথভাবে বিক্রি করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ট্রাম্প যে ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রে মজুদ করবেন, তা তো বলাই বাহুল্য। অথচ তিনি তেল কিনে নিয়ে গিয়েও মজুদ করতে পারতেন। ট্রাম্প বর্তমানে যে নীতি অনুসরণ করছেন, তা ‘জঙ্গল ল’। অর্থাৎ যে যাকে পারবে, তাকে খাবে;যেমন বাঘ-সিংহ হরিণকে খায়।
ট্রাম্প কথায় কথায় বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেন এবং করেন। কিছুদিন আগেও তিনি ভারতের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। ভারতের ‘দোষ’ তারা রাশিয়া থেকে তেল কিনেছে। কিন্তু তিনি যে তেলের জন্য ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকেই তুলে নিয়ে গেছেন, তা বলবে কে? ট্রাম্প ইউরোপকে বুঝিয়েছেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে রাশিয়া সেই অর্থ কাজে লাগিয়ে ইউক্রেনে হামলা করছে। অথচ তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না; বরং রাশিয়া থেকে সুবিধা নিয়ে যাচ্ছেন। রাশিয়া পৃথিবীর সর্ববৃহৎ দেশ এবং তাদের রপ্তানি বাণিজ্য করার মতো দেশের অভাব নেই। পাশাপাশি এটাও বলবো,রাশিয়া যেন ইউক্রেনে আগ্রাসন বন্ধ করে দেয়।
এদিকে ট্রাম্প যেভাবে কথায় কথায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারত, চীন, রাশিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ওপর পৃথিবীর সব মহাদেশের অধিকাংশ দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করছেন, তাতে পৃথিবীর এসব দেশ যদি একজোট হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বয়কট করে, অর্থাৎ দেশটির সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিরাট ক্ষতির মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ দেশটি যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, রাতারাতি তা তারা তৈরি করতে পারবে না। আবার দেশটি যেসব পণ্য রপ্তানি করে, সেসব পণ্য রপ্তানি করতে না পারলে বিরাট ক্ষতির মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি।
মানলাম, ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী। কিন্তু দেশ পরিচালনা আর ব্যবসা পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। কারণ ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা অনেক ছলচাতুরির আশ্রয় নেন; কিন্তু ট্রাম্প দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে তা করলে ধরা খেয়ে যাবেন। এতে হুমকির মুখে পড়বেন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দারা।
এদিকে ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, তিনি আন্তর্জাতিক কোনো আইন মানেন না; সবকিছুই নির্ভর করে তার ইচ্ছার ওপর। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রথম এবং সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের প্রেসিডেন্টের মুখের কথাই এখন স্বৈরশাসকের মুখের কথার মতো শোনায়। এতে ইউরোপ বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে বেশ কিছু চুক্তি রয়েছে। এদিকে কিছুদিন আগেই ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। এখন আবার আরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিচ্ছেন। এ অবস্থায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের মিত্র রাষ্ট্র থেকে শত্রু রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্প যে খেলা খেলে যাচ্ছেন, তা যদি শিগগিরই বন্ধ না করেন, তাহলে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়বে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র বৈকি!
আর এ খেলায় অন্যান্য মহাদেশও বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষা পাবে না।
সর্বোপরি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়া এই ছয় মহাদেশের দেশগুলোর ভালো থাকতে হলে সব ধরনের যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে আগে। আর এ উদ্যোগ নিতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই।
কলাম লেখক : ইতালি প্রবাসী সাংবাদিক
রিপোর্টার্স২৪/এসসি